বালাকোটের ইতিহাস অবলম্বনে

ধারাবাহিক উপন্যাস: বালাকোটের শহীদ (পর্ব-১২)

২৩ মে ২০২০, ০৫:৪৫
আরীফুর রহমান

পর্ব-১২ (১১ পর্বের পর..)

বিশ্বাসঘাতকতা

সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহ. নওশিহরা যুদ্ধে বিজয় লাভ করার দ্বারা মুজাহিদদের আত্মবিশ্বাস বলিষ্ঠ হয়ে যায়। তাদের ভেতরে জাগ্রত হয় উৎসাহ-উদ্দীপনা। 

আকাবা থেকে সরদার খাবী খান, আশরাফ খান ও অন্যান্য ইউসুফ ঝাই নেতৃবৃন্দ, পেশাওয়ারের দুই ক্ষমতাশীন নেতা; সরদার ইয়ার মুহাম্মদ খান ও সরদার সুলতান মুহাম্মদ খানকে এক দীর্ঘ চিঠি লিখেন। এ চিঠিতে সীমান্তের মুসলমানদের দূরবস্থা, শিখদের নির্যাতন এবং এ প্রেক্ষিতে সাইয়্যিদ আহমদ রহ. -এর সাথে একাত্মতা ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। 

সাথে সাথে এ চিঠিতে তাদেরকে আমীরুল মুমেনীনের হাতে বাইয়াত গ্রহণের দাওয়াতও দেয়া হয়। 

সরদার ইয়ার মুহাম্মদ খান ও সরদার সুলতান মুহাম্মদ খান এ চিঠিকে নিজেদের জন্য অপমানের কারণ মনে করে। এ চিঠির কারণে তাদের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল তা মনের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে। কিন্তু পরিস্থিতির বিবেচনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে তারা নিজেদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং জিহাদে অংশগ্রহণের সম্মতি জানিয়ে সাইয়্যিদ সাহেবের কাছে চিঠি লেখেন। 

সরদার ইয়ার মুহাম্মদ খান ও সরদার সুলতান মুহাম্মদ খান ‘সামাহ’ নামক স্থানে অভিযানের সংকল্প নিয়ে সৈন্য-সামন্ত ও গোলা-বারুদ নিয়ে পেশাওয়ার থেকে নওশিরাহ অভিমুখে রওনা করেন। 

সাইয়্যিদ আহমদ রহ. তাদেরকে স্বাগত জানাতে হান্ড নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে যান। এ বাহিনীর সংখ্যা ছিল তখন বিশ হাজার। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন মিলেএ বাহিনীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল আশি হাজারে। এই বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন নওশিরায়।

অতঃপর এই সম্মিলিত বাহিনী সেখান থেকে শায়দুর রওয়ানা করে, কেননা বুধ সিংহের নেতৃত্বে শিখ বাহিনী তখন সেখানে সমবেত হয়েছিল। শায়দুর থেকে মাত্র এক ক্রোশ দূরে আকাবা নামক স্থানে মুসলিম ফৌজ ছাউনী ফেলে।

    

ইয়ার মুহাম্মদ খানের তাবু। সামনে বসা তারই ফৌজের এক সৈন্য। সৈন্যের নাম আলমাছ। আলমাছ খুব চতুর লোক। দু’বন্ধুর মাঝে বিভেদ সৃষ্টিতে সে খুবই পারদর্শী। আদর্শ বিবর্জিত লোকদের চরিত্র তার মাঝে খুব ভালোভাবে পরিলক্ষিত হয়। মূলত তাকে কোন হীন কাজ করানোর জন্য ডেকে এনেছে ইয়ার মুহাম্মদ খান। সে বলল : আলমাছ, তোমাকে ডেকেছি একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। 

  • জি জনাব, বান্দা আপনার জন্য নিজের জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না। 
  • এ জন্যই তো তোমাকে আমার খুব পছন্দ।
  • এটা জনাবের মহানুভবতা। 
  • সাইয়্যিদ আহমদের খাদেমদের সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে এ রকম দুয়েকজন লোক আমার চাই। আমি তাদেরকে প্রচুর স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে ভরিয়ে দিব।
  • জি জনাব।
  • তোমার দায়িত্ব হলো, এরকম লোক খুঁজে বের করা। 
  • জনাব, এ নিয়ে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
  • তোমার দায়িত্ব কি পূর্ণাঙ্গরূপে বুঝতে পেরেছো?
  • জনাব, আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে আমার কোনোরূপ সমস্যা হয়নি। আমি খুব দ্রæত আপনাকে ফলাফল দেয়ার চেষ্টা করব। সরদারকে কুর্নিশ করে আলমাছ তাবু থেকে বেরিয়ে গেল। 

সাইয়্যিদ আহমদ রহ.-এর তাবু থেকে দূরত্ব বজায় রেখে এক জায়গায় সে অবস্থান নিল। লক্ষ্য করতে লাগলো, কারা সাইয়্যিদ আহমদ রহ.-এর খেদমত করে। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেল, বিশেষ খাদেমদের সাথে গল্পগুজব করে একজন বেরিয়ে এলো। যার সাথে আগে থেকেই তার পরিচয় ছিল। লোকটির নাম নজর মুহাম্মদ।

নজর মুহাম্মদ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আলমাছ তার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হল। আলমাছ জিজ্ঞাসা করল-

  • নজর মুহাম্মদ ভাই! তুমি কেমন আছ? তোমাকে কতদিন যাবত  দেখি না। 
  • আলমাছ ভাই! আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। আমিও তো আপনাকে কতদিন যাবত দেখি না। 
  • তোমার কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে।
  • গরীবকে আপনি এতো ভালোবাসেন!
  • আলমাছ নজর মুহাম্মদের বাহু ধরে টেনে এক পাশে নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গেল এবং পাশাপাশি বসে কথাবার্তা বলতে লাগলো-
  • ভাই তোমার খুঁজেই আমি এদিকে এসেছি। যাক তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল। আমি তোমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেয়ার জন্য এসেছি।
  • কি কাজ ভাই?
  • কাজটি করে দিতে পারলে তোমাকে এত পুরষ্কার দেয়া হবে যে, তোমার চৌদ্দ পুরুষ খেয়েও তা শেষ করতে পারবে না। 
  • এত পুরষ্কার! কি কাজ ভাই তাড়াতাড়ি বলুন, না বললে আমি বুঝবো কিভাবে? (চলবে.. চোখ রাখুন অনুসন্ধানে)


লেখক: মাওলানা আরীফুর রহমান, সিনিয়র মুদাররিস, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলূম, শ্রীপুর, গাজীপুর

মন্তব্য লিখুন :