রাজধানীর স্কুল-কলেজে ভর্তির কী হবে?

০৮ নভেম্বর ২০২০, ২৩:৪৩
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে রাজধানীর স্কুল-কলেজে ২০২১ সালের শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে কোনো তোড়জোড় নেই-ছবি সংগৃহীত

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে রাজধানীর স্কুল-কলেজে ২০২১ সালের শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে কোনো তোড়জোড় নেই। প্রতিবছর এই সময়ে ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রস্তুতি নেয়নি নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো। মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর থেকে নভেম্বরেই ভর্তি সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়; যা এখনো হয়নি। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন তারা। অধিদফতর বলছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মতো কাজ করবে তারা। এ ছাড়া করণীয় ঠিক করতে প্রস্তুতি আছে তাদের। 

প্রতিবছর নভেম্বর মাসে নামিদামি স্কুলগুলো তাদের ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু করে। আর ডিসেম্বরে নেওয়া হয় লটারি ও ভর্তি পরীক্ষা। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের পছন্দের স্কুলে ভর্তি করাতে ছোটেন এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে। কিন্তু এবার করোনার কারণে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

গত ৮ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হলে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়ে আগামী ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ সময় অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরো কত দিন বন্ধ থাকবে, তা-ও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। এই অবস্থায় অভিভাবকদের প্রশ্ন, এবার স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার কী হবে?

সরকার এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করেছে। স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষাও না হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অর্থাৎ শিক্ষাবর্ষ নিয়মিত রাখতে তারা পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে স্কুল খোলা সম্ভব না হলেও যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো এবং শিক্ষাবর্ষ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। 

ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অন্যান্য বছর সবার আগে ভর্তি প্রক্রিয়া হাতে নিলেও এখন পর্যন্ত গভর্নিং বডি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ক্লাস ওয়ানে ভর্তির জন্য লটারি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। ভর্তির জন্য আবেদন ও লটারি শেষ করতে নভেম্বরের শুরুতেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়। জানুয়ারিতে ভর্তি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

এসবের মাঝেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে গত ১৪ অক্টোবর বৈঠক করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। সেখানে ভর্তি পরীক্ষার চারটি সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। যদি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তাহলে সরাসরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এটি সম্ভব না হলে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নিলে ইন্টারনেটের গতি কেমন থাকবে বা সবাই ভর্তি পরীক্ষায় বসতে পারবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া আরো দুটি বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সর্বশেষ মূল্যায়নের প্রাপ্ত নম্বর বা গ্রেডের ভিত্তিতে ভর্তি করার ব্যাপারেও প্রস্তাব আসে। সব শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফওজিয়া রেজওয়ান বলেন, ক্লাস ওয়ানের ভর্তির বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর থেকে এখনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ২০২১ সালের আসন সংখ্যাও চূড়ান্ত হয়নি। অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে প্রস্তুতি নিতে। নির্দেশনা আসলে ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অধ্যাপক ফওজিয়া আরো বলেন, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভর্তি নিতে প্রায় দেড় মাস সময় লাগে। করোনার কারণে এখনো কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া গেলেও আমরা প্রস্তুত রয়েছি। শিগগিরই গভর্নিং বডিতে বিষয়টি ওঠানো হবে।

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, ২০২১ সালের শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে মন্ত্রণালয় বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর নির্দেশনা দিলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ভর্তির বিষয়ে এখনও নির্দেশনা আসেনি।

আজিমপুর গর্ভ. গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দীক বলেন, করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতি মত দিয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি এবং অংক বিষয়ের পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এতে করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এ কারণে পরীক্ষা পদ্ধতিতে মতামত দেওয়া হয়েছে। তবে অল্প সংখ্যক করে নয়টি ধাপে এ পরীক্ষা নিতে তারা প্রস্তাব করেছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতে কেউ কেউ এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে পরীক্ষা নেওয়া হলে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন বলে কেউ কেউ মত দিয়েছেন।

মাউশির সহকারী পরিচালক (বিদ্যালয়-১) আমিনুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘অক্টোবরে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা জারি করা হয়েছে। তবে কোন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ১০ হাজারের বেশি শূন্য আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়ে থাকে। এসব আসনে ভর্তির জন্য প্রায় এক লাখের মতো আবেদন জমা হয়। প্রতি আসনে ৫-৬ জন প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এ কারণে ভর্তির সময় শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বড় সমাগম হয়। এবার করোনা পরিস্থিতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক বেলাল হোসাইন বলেন, ‘স্কুলে ভর্তি নিয়ে আমরা একাধিক বৈঠক করেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও করেছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে মন্ত্রণালয়।’ 

মন্তব্য লিখুন :