সিলেবাস সংস্কারে ইউজিসির নির্দেশনা

মানতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঢিলেমি

২২ নভেম্বর ২০২০, ০১:৩৫
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
ছবি-সংগৃহীত

উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত মান অর্জনের ক্ষেত্রে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও গুণগত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে সিলেবাস হালনাগাদকরণ জরুরি বলেও মনে করে কমিশন।

১৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে এ কথা বলা হয়। 

চিঠিতে আরো বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে প্রোগ্রাম অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি প্রোগ্রাম অনুমোদনের তারিখ হতে প্রতি ৪ বছর পর অনুমোদিত সিলেবাসসমূহ কমিশন প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড সিলেবাসের গাইডলাইন অনুসরণে হালনাগাদ করার জন্য ২০১৯ সালে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

চিঠির এই ভাষা থেকেই বোঝা যায়, ২০১৯ সালে নির্দেশনা দেওয়া হলেও সব বিশ্ববিদ্যালয় এই নির্দেশনা পালন করেনি। এ কারণেই ২০২০ সালের শেষ সময়ে এসে আবারো চিঠি দিয়ে তাগাদা দিতে হয়েছে। 

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর একজন শিক্ষক বলেন, এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেগুলোতে ১০ বছর ধরে একই সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে। এগুলোতে ‘স্থায়ী অধ্যাপকের’ সংখ্যা হাতে গোনা। যারা খ-কালীন শিক্ষকতা করেন, তারা ক্লাস নেওয়া ও পরীক্ষার খাতা দেখা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখেন না। তবে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত সঠিকভাবেই সবকিছু হালনাগাদ করে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। 

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান ড. শেখ সফিউল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষা একটি চলমান বিষয়। এটিকে এক জায়গায় স্থির করে রাখলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। এ জন্য অবশ্যই ধারাবাহিকভাবে সিলেবাস হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, যখন কোর্সের অনুমোদন দেওয়া হয় তখনই চার বছর অন্তর সিলেবাস হালনাগাদের শর্ত দেওয়া হয়। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এই শর্ত পালন না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোর্সের অনুমোদন বাতিল করাসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা এর আগে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সের অনুমোদন বাতিল, এমনকি শর্তাবলি না মানার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়েরই অনুমোদন বাতিল করেছি।

ওই চিঠিতে সিলেবাস হালনাগাদের ক্ষেত্রে ‘কমিশন প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড সিলেবাসের গাইডলাইন’ অনুসরণের কথা বলা হলেও সেই স্ট্যান্ডার্ডের ব্যাপারে চিঠিতে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। 

ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, যখন কোর্সের অনুমোদন দেওয়া হয় তখনই বলে দেওয়া হয় কীসের ভিত্তিতে সিলেবাস সংশোধন করতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা কোনো বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড হতে পারে না। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট এবং বৈশ্বিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে সিলেবাস হালনাগাদ করতে হয়। মূলত সময়ের চাহিদার আলোকেই সিলেবাস সংশোধন করতে বলা হয়। তবে এই গাইডলাইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা মানছে, তার জবাবে তিনি কিছু জানাননি। 

ড. শেখ সফিউল ইসলাম বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলেয়ে চলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগে একসময় সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের নিউজপেপার এডিটিং এবং পেজ মেকআপ গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হতো। কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ডিজিটাল মিডিয়ার ওপরে। যেমন আমরা এখন অনার্সের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কমিউনিকেশন ও সোশ্যাল মিডিয়া, আইসিটি, মডার্ন পাবলিক রিলেশন্স, ভিডিও জার্নালিজমের মতো কোর্সগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পড়াই।

শেখ সফিউল ইসলাম আরো বলেন, এই কাজ করার জন্য আমরা মিডিয়া এক্সপার্ট, সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং একাডেমিশিয়ানদের সমন্বয়ে ওয়ার্কশপ করি। সবার মতামত নিয়ে বর্তমানে কোনটি প্রয়োজন, আগামী দিনে কোন বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে, সেসব বিষয়ে মতামত নিয়ে সিলেবাস হালনাগাদ করে থাকি।

প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (মনোনীত) ড. হুমায়ুন কবির বলেন, মহাজোট সরকার যেসব সেক্টরে সফলতার পরিচয় দিয়েছে, শিক্ষা তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমান সরকারের শিক্ষাবিষয়ক কর্মকা- নিয়ে জনমনে একটি ইতিবাচক ধারণা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে চাই পরিকল্পিত কর্মমুখী শিক্ষা; কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক নতুন বিভাগ চালু করছে দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি অনুমোদন ছাড়াই কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছু বিভাগ খোলার চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়ার পর ইউজিসি তা নাকচ করে দিয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগ থেকে দুই, তিন, এমনকি চারটি বিভাগও খোলা হচ্ছে। এসব বিভাগের সিলেবাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একটি বিভাগই যথেষ্ট। যেসব বিষয়ে পাঠদানের জন্য একটি কোর্সই যথেষ্ট, সেসব বিষয়েও বিভাগ খোলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কর্মমুখী শিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান সহায়ক। তবে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অপ্রয়োজনীয় বিভাগ খোলায় উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেও বেকারত্বের হার বাড়ছে।

ড. হুমায়ুন কবির বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে চলছে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্প-কারখানা, প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার সময়োপযোগী শিক্ষা। 

মন্তব্য লিখুন :