তরুণ লেখকদের জন্য ‘লাবীব আব্দুল্লাহ’র পরামর্শ

০৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৭
মুজীব রহমান

লেখক, গবেষক, দাঈ, কলামিস্ট লাবীব আব্দুল্লাহ। বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের ‍অন্যতম নাম। তিনি মানুষ গড়ার কারিগর ও লেখালেখিতে আগ্রহী তরুণদের পরামর্শদাতা-অভিভাবক।

যেসব তরুণ ভালো লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেছেন, তাদের তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন অনুসন্ধান ডটকমের এক অন্তরঙ্গ আলোচনায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন অনুসন্ধান প্রতিবেদক মুজীব রহমান।

অনুসন্ধান: অনেক তরুণরা এখন লেখালেখিতে আসছে। কিন্তু কী লেখবে, কীভাবে লেখবে এ নিয়ে খুব সমস্যায় ভুগে। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?

লাবীব আব্দুল্লাহ: লেখালেখির ক্ষেত্রে পাঠ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখালেখির আগে প্রচুর পড়তে হবে। আমাদের তরুণদের মাঝে পাঠের খুব অভাব আছে। লেখালেখির প্রথম ধাপ বেশি বেশি পড়া। এটা আগে ভালভাবে করতে হবে।

অনুসন্ধান: একজন তরুণ লেখকের জন্য কী পরিমাণ পাঠের প্রয়োজন?

লাবীব আব্দুল্লাহ: পাঠের কোন শেষ নেই। একটা কথা আছে “১ পৃষ্টা লেখতে হলে ১০০ পৃষ্টা পড়তে হয়”। লেখালেখির একটা প্রস্তুতি পর্ব আছে সেটা মানতে হবে। এলোপাতাড়ি ভাবে যা ইচ্ছা তাই পড়লে হবে না।

যে বিষয়ে লেখতে আগ্রহী সে বিষয় নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়তে হবে। কেউ ছোট গল্প লেখতে আগ্রহী, তাকে সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ এমন ছোট গল্প ভালভাবে পড়তে হবে। ছড়া কবিতাতে আগ্রহী হলে বেশি বেশি ছড়া কবিতা পড়তে হবে। ছন্দ মাত্রা ইত্যাদি চর্চা করতে হবে। উপন্যাস প্রবন্ধ কলাম। সবগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা।

তরুণদের একটা বড় সমস্যা হল, সে কোন বিষয়ে লেখতে চায় সেটা নির্ধারণ করে না।

বিষয় নির্ধারণ করে সে বিষয়ে ধীরে ধীরে অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।

অনুসন্ধান: একজন নবীন পাঠক-লেখক কোন ধরণের লেখকের বই পড়বে। অনেক লেখালেখিতো ইসলাম বিদ্ধেষী।

লাবীব আব্দুল্লাহ: যারা ইসলাম বিদ্ধেষী তাদের সব লেখায় কিন্তু ইসলাম বিদ্ধেষমূলক নয়। যেমন হুমায়ুন আজাদের “ফুলের গন্ধে ঘুৃম আসেনা” ও “কিশোর সমগ্র” এর কয়েকটি জায়গা ছাড়া পুরোটাই কিশোরদের জন্য চমৎকার সমগ্র। বাংলা সাহিত্য চর্চা করতে গেলে অবশ্যই রবি ঠাকুর, কাজী নজরুল, শরৎ, বিভূতি, তারা শংকর, হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ, আল মাহমুদ এদের লেখা পড়তে হবে।

এখন একটি কথা হল তাদের সব বই-ই কি পড়তে হবে? তাদের সব বই-ই কি সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ? এজন্য অবশ্য কাউকে গাইড হিসেবে মানতে হবে। যে সঠিক পথনির্দেশনা দিবে।

অনুসন্ধান: অনেকেই সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে একাডেমিক পড়া ভালোভাবে পড়েনা। পরবর্তীতে সমস্যায় পড়তে হয়।

লাবীব আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ। অনেক তরুণরাই সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে মূল লেখাপড়া ভালোভাবে করে না। পরবর্তীতে দেখা যায়, ভাল মেধা থাকা সত্ত্বেও ভাল আলেম হতে পারেনা। সাহিত্য চর্চা হতে হবে ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি। অবশ্যই প্রথমে ক্লাশের পড়া ভালোভাবে পড়তে হবে। শিখতে হবে।

অনেক ছাত্রদেরই সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে ক্লাশের পড়া ভালভাবে না পড়ার কারণে শিক্ষকরা সাহিত্য চর্চার বিরোধিতা করেন। এদের কারণে অনেক ভালো ছাত্ররাও সাহিত্য চর্চায় বাধার সম্মুখীন হয়।

অনুসন্ধান: একাডেমিক লেখাপড়া আর সাহিত্য চর্চার মাঝে সমন্বয় করবে কীভাবে?

লাবীব আব্দুল্লাহ: একাডেমিক লেখা পড়ার বিভিন্ন স্তর আছে। প্রাথমিক স্তর। মাধ্যমিক স্তর। উচ্চস্তর। প্রাথমিক স্তরের একটা ছাত্র সেতো আরবী ইবারত পড়াটায় ভালোভাবে শেখেনি। এখন তার ক্লাশের পড়া লেখার বাহিরে সাহিত্য চর্চা বা অন্য কোন কিছুই করা উচিত নয়।

প্রাথমিক লেখাপড়ার পর মূল লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে অন্য বিষয়গুলো চর্চা করবে।

অনুসন্ধান: ইদানিং তরুণ লেখকদের মাঝে টুপি পাঞ্জাবি নিয়ে একটা লুকোচুরি ভাব খেলা করে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

লাবীব আব্দুল্লাহ: যারা এমনটা করে তারা মনে করে টুপি পাঞ্জাবি পড়লে মনে হয় লেখক হওয়া যায় না। জাতে ওঠা যায়না। এটা একটা মারাত্মতক ভুল চিন্তা-ভাবনা।

আমাদের আবু তাহের মেসবাহ, উবায়দুর রহমান খান নদভী, শরীফ মুহাম্মাদ, যায়নুল আবেদীন” তারা কী লেখক না? তারা কি জাতে ওঠেননি?

প্রত্যেকের আত্মপরিচয়টি ভালোভাবে জানা থাকা উচিত। যে লেখক নিজের আত্মআইডেন্টি জানে না। নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চায়না। সে লেখালেখি করে কী করবে আমার বোঝে আসে না।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অগ্রজ লেখকরা যদি একটু তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে মমতা দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দেয় আমি মনে করি তারা ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি ধমক দিয়ে দূরে ঠেলে দেয় এবং বলি এরা আমাদের কেউ নয়, তাহলে আমি মনে করি এটা হবে একটা অত্যন্ত মারাত্মক আত্মঘাতী চিন্তা।

মন্তব্য লিখুন :