আলেমদের উদ্দেশ্যে আব্দুল কাদের জেলানী রহ. এর ভাষণ

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:৩২
ডক্টর আব্দুস সালাম আযাদী

অনেক দিন পড়া হয়নি আলফাতহুর রাব্বানি ওয়াল ফায়দুর রাহমানি বইটা। কায়রোর আলহালাবি প্রকাশনা সংস্থা থেকে বের হওয়া ইমাম আব্দুল কাদের জীলানির (র) এই বইটি এক সময় আমার ঘুম হারাম করে দিতো। একজন দাঈ ইলাল্লাহ এর ইসলাহি বক্তব্য কেমন হয় তা এই বইটা পড়লে বুঝা যায়। এই বইটার বিভিন্ন স্থানে তিনি তার যামানার আলিমদের অবস্থা দেখে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন মনে হয়েছে। আজ রাতে তার বইটা নিয়ে ঘুমাতে পারলামনা। রাজা বাদশাহ আলিমদের পদস্খলনে সেই যুগে আরবদের উপরে ক্রুসেডররা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবং দেশের পর দেশ দখল করে নেয়। সেই ক্রুসেডে বিজয় আনতে তিনি ও তাঁর সিনিয়র ইমাম গাযযালি মুজাদ্দিদের কাজ করেন। মজার কথা হলো, এঁরা দুইজন কেও ই আমাদের ধ্বংশের জন্য খৃস্টানদের দায়ী করে খুব বেশি বক্তব্য রাখেন নি। তাঁরা দুই জনেই মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরের রোগ গুলো খুঁজে বের করেন ও সেগুলো সারিয়ে নিতে সফলতার সাথে কাজ করেছেন। 

সে যুগে তিনি মুসলিম সমাজের রোগ সমূহের জন্য আলিমদেরও অনেক দায়ী করেছেন। এই জন্য আলিমদের ইসলাহ করতে যেয়ে তিনি অনেক বক্তব্য বিভিন্ন উপলক্ষ্যে দিয়েছিলেন। যেগুলো পড়লে মনে হবে তিনি এই যুগের আলিমদের নিয়েই যেন কথা বলেছেন। সুবহানাল্লাহ!! 

তাঁর সেই বক্তব্যের কিছু নিচে অনুবাদ করছিঃ 

১- “আখিরাতের পথে বসে দুনিয়া খোরদের হাত থেকে হে দুনিয়া হরণকারীরা, ওহে হকের জাহিলরা, ঐ সব সাধারণ লোকদের চেয়ে তাওবাহ করার বেশি হকদার আজ তোমরা। ওদের চেয়ে তোমাদেরই উচিৎ পাপ স্বীকার করে নেয়া। তোমাদের মাঝে কোন কল্যান নেই। (পৃ ২৮৯) 


২- তিনি তার মাদ্রাসায় ৫৪৬ হিজরির রজব মাসের ৯ তারিখে এক বক্তৃতায় বলেনঃ “যদি তোমার কাছে জ্ঞানের কোন অর্জন বা বরকত থাকতো, তাহলে তোমার নফসের খায়েশ ও চাহিদা পূরণ করতে আজ রাজা বাদশাহদের পিছে দৌঁড়াতে না। আলিমের তো এমন দুই পা থাকতে নেই যা দিয়ে সে মানুষের দরজায় দরজায় দৌঁড়ায়, দুনিয়া বিমূখের এমন দুই হাত থাকতে নেই যা দিয়ে সে মানুষের অর্থ গ্রহন করে। আল্লাহপ্রেমীদের এমন দুই চোখ থাকতে নেই যা দিয়ে সে অন্যের দিকে তাকায়।“ (পৃ ২০২)

৩- ঐ বছরের ২০ শে শা’বানে আরেক বক্তৃতায় তিনি বলেনঃ “হে ইলম ও আমলের খিয়ানাতকারীরা, হে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুরা, হে আল্লাহর বান্দাহদের (নানা দলে) বিভাজনকারীরা, তোমরা প্রকাশ্যে জুলুমে ও সুস্পষ্ট মুনাফেকিতে লিপ্ত রয়েছো। এই মুনাফেকি আর কত দিন? হে উলামা ও যাহিদেরা (?)! আর কতদিন রাজা রাজড়াদের কাছে যেয়ে দুনিয়ার একটা রশি, বা কিছু বাসনার বস্তু ও কিছু মজাদার জিনিষ পাওয়ার লোভে মুনাফিকি করতে থাকবে? তোমরা ও এই যুগের অধিকাংশ রাজা বাদশাহরা আল্লাহর দেয়া সম্পদের ব্যবহার করতে ও মানুষের হক দেয়ার ক্ষেত্রে জালিম ও খিয়ানাতকারী। ও আল্লাহ, মুনাফিকদের শক্তি তুমি ভেঙে দাও, জালিমদের তুমি উৎখাত করে দাও। তুমি এই ধরণীকে তাদের থেকে পাক করে দাও, ওদের সংশোধন করে দাও, আমীন”। (পৃ ১৭৩) 

৪- তার ছাত্রদেরকে এই সব আলিমদের কাছে না পড়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে বলেনঃ হে ছেলে, আল্লাহ আযয ওয়া জাল্লার ব্যাপারে অজ্ঞ এই সব তথাকথিত আলিমদের দেখে ধোঁকায় পড়োনা। ওদের জ্ঞান আজ ওদের বিরুদ্ধে, ওদের পক্ষের নেই। ওরা হয়ত আল্লাহ আযয ওয়া জাল্ল এর কিছু আদেশ নিষেধের ব্যপারে জ্ঞান রাখে, কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে তারা মূর্খ। তারা আল্লাহ থেকে পালায়, এবং পাপের পশরা নিয়ে, নিজেদের পদস্খলন দিয়ে তারা আল্লাহর বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধে নেমেছে। ওদের নাম আমার কাছে তারিখ সহ গুণে গুণে লিখিত আছে”। (পৃ ৪২)

৫- তিনি সাধারণ জনগণকে তাদের ওয়াজ বা কথা শুনতে নিষেধ করে বলেনঃ “আল্লাহর বান্দাহরা, তোমরা ঐসব লোকদের ওয়াজ শুনোনা যারা তোমাদের মনে আনন্দের খোরাক দেয়। ওরা রাজা বাদশাহদের কাছে নিজদের তুচ্ছ করে দেয়, এবং তাদের সামনে গেলে একেবারে ম্রিয়মান হয়ে যায়। তাদেরকে আল্লাহর আদেশগুলো ওরা শোনায়ে দেয়না, নিষেধগুলো বলে দেয়না। তারা রাজা বাদশাহদের সমানে গেলে এই সব কথা বললেও মুনাফিকি ও ভণিতা দিয়ে তা বলে। আল্লাহ এই সব মুনাফিকদের থেকে জমিনকে পবিত্র করে দিন, অথবা তাদের ক্ষমা করে তাঁর দ্বারের দিকে 

ওদের হেদায়েত করুন। আমার খারাপ লাগে যখন দেখি ওদের কেও আল্লাহ আল্লাহ করছে, অথচ সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবছে”। (পৃ ২৪৫)  

৬- আলিমদের একটা জিনিষ ছিলো সে সময় মারাত্মক। তা হলো একে অপরে ঝগড়া ঝাটি। একজন তার প্রতিপক্ষের উপরে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা গর্ব অহংকারে ফেটে পড়তো। এদের লক্ষ্য করে তিনি বলছেনঃ “ তুমি পাগলামিতে মত্ত হয়ে কিতাব থেকে নকল করে শব্দ বুণে যাও, ও তা দিয়ে কথা বলো। কি হবে তোমার, যদি ঐ কিতাব হারায়ে যায়, কিংবা আগুণে তা পুড়ে যায়? অথবা কি হবে তোমার, যদি তোমার দেখা ঐ আলো নিভে যায়? যে ইলম শেখে, ও আমল করে, এবং আন্তরিক হয়, তার ইলেমের সেই আলোকবর্তিকা ও প্রস্রবন তার অন্তরে আল্লাহ আযয ওয়া জাল্লার নূর তৈরি করে দেয়, ফলে তা তাকেও যেমন আলোকিত করে, অন্যকেও করে তেমনি। ও দূর্মুখের বেটারা, দূর হয়ে যাও। ও নফসের দাস ও প্রবৃত্তির দাসদের হাতের লেখা বইএর সন্তানেরা, ধ্বংশ হও তোমরা, ব্যক্তি বিশেষ নিয়ে তোমরা আজ পরষ্পরে ঝগড়ায় লিপ্ত, নিজেরাই নিজেদের ভেঙে ফেলছো, বরবাদ হচ্ছো, তাই তোমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছোনা। কিভাবে তোমরা সাধনার বলে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তোমাদের আগে ধেয়ে চলাদের গতি রোখ করবে”? (পৃ ২৩৪)

৭- আলিমগণের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা আলিম সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলে বলে মনে হয়। এই জন্য ২০শে রজব ৫৪৬ হিজরিতে তাঁর এক ওয়াজে তিনি বলেনঃ “হে আলিম, তোমার কথাগুলো আজ বের হয় তোমার জিভ থেকে, মন থেকে নয়। বের হয় তোমার অবয়ব থেকে ভেতর থেকে নয়। আল্লাহ তোমাদের কোন বরকত না দিন, হে মুনাফিকের দল। তোমাদের সংখ্যা আজ বেড়েই চলেছে। তোমাদের সকল কাজের মূল লক্ষ্য আজ তোমাদের ও সৃষ্টির মাঝে সম্পর্ক গড়ায় ব্যস্ত থাকা, আল্লাহর মাঝে নয়। ও আল্লাহ, এদের মাথার উপর আমার এমন সামর্থ্য দাও যাতে করে আমি এদের থেকে এই দুনিয়াকে পবিত্র করতে পারি। এই যুগে মুনাফেকির আলামত হলো, আমার কাছে না আসা, আমাকে দেখে সালাম না দেয়া, সালাম দিলেও সেখানে অনেক ভণিতা থাকা। দীন ইসলাম আজ শেষ হচ্ছে, তার দেয়াল যেন ঝুরঝুর করে ধ্বসে পড়ছে। ও আল্লাহ আমার এমন সাহায্যকারী দাও যাতে করে এই দীনকে আমি গড়তে পারি। ও মুনাফিকেরা, তোমাদের হাতে এই দীন কি নিয়ে গড়ে উঠবে? তোমাদের কোন কারামাত নেই সম্মান নেই যার উপর ভিত্তি করে এই দীন গড়ে উঠতে পারে। তোমরা কিভাবে গড়বে, অথচ তোমাদের মাঝে গড়ে তোলার শিল্পও নেই, গড়ার হাতিয়ার ও নেই।?  হে অজ্ঞের দল, তোমরা তোমাদের দীনী দেয়ালটা আগে মজবুত করে গড়ে নাও, তার পর অন্যেরটা গড়তে ব্যস্ত হয়ো। তোমরা আমার সাথে শত্রুতা করলে আমিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স্বার্থে তোমাদের সাথে শত্রুতা করবো। কারণ আমিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যের জন্য দাঁড়ায়েছি। তোমরা বিদ্রোহ করোনা, আল্লাহ তাঁর হুকুমকে বিজয়ী করবেনই। ইউসুফের (আ) ভায়েরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিলো, কিন্তু তারা তা পারেনি, কিভাবে তা পরবে? অথচ তিনি তো আল্লাহর কাছে একজন রাজা হিসেবে লিখিত, নবী হিসেবে মনোনিত, এবং সিদ্দীকীনদের মধ্যে গণ্য। আল্লাহর সৃষ্টির উপকার তাঁর হাতেই হবে তা পূর্বেই নির্ধারিত। এই যুগের হে মুনাফিকরা, আমার ক্ষেত্রে তোমাদের অবস্থানও তদ্রুপ। তোমরা আমাকে শেষ করতে চাও, অথচ তোমাদের কোন মহত্ত্বতা নেই। কাজেই তোমাদের হাত আমার কাছে পৌঁছতে পারবেনা”। (পৃ ২২৩)

মন্তব্য লিখুন :