মুহাররাম-আশুরার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ইতিহাস

২৩ আগস্ট ২০২০, ২৩:০২
মুহাম্মদ হারুন আযিযী নদভী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সমস্ত প্রশংসা নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য। হাজার হাজার দরূদ ও সালাম বর্ষিত হউক মানবজাতির শিক্ষক ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর এবং তাঁর পরিবার ও ছাহাবীগণের উপরও। আম্মা বা’দ!

মুহাররাম মাসের গুরুত্ব 

হিজরী ক্যালেন্ডারের একটি বৈশিষ্ট হলো, এটি শুরু হয় সম্মানিত মাস দিয়ে আবার শেষও হয় একটি সম্মানিত মাস দিয়ে। হিজরী বর্ষ হিসেবে বছরের সর্বপ্রথম মাস হল, মুহাররাম মাস। এটি অতি মহান এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। 

১. এটি চারটি হারাম তথা সম্মানিত মাসের অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীনদের সাথে রয়েছেন’। (সূরা তাওবাঃ ৩৬) 

এই আয়াতে যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলা হচ্ছে তাহল, যুল কাদা, যুল হাজ্জাহ, মুহাররাম এবং রজব। 

হযরত আবুবাকরা (রজিঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বছর বার মাসে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। তিনটি লাগাতার, তা হলো, যুলকা’দাহ, যু হিজ্জাহ এবং মুহাররাম। আর একটি হলো রজব মাস তা জুমাদাসসানী ও শাবানের মধ্যখানে। (বুখারীঃ ২৯৫৮) 

২. এইমাসের গুরুত্বের আরেকটি কারণ হলো, এটাকে ‘আল্লাহর মাস’ খেতাব দেয়া হয়েছে। হযরত আবুহুরাইরা (রজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হল আল্লাহর মাস মুহাররামের সিয়াম’। (মুসলিমঃ ১৯৮২) 

যদিও সব মাস আল্লাহরই সৃষ্টি তদুপরী মুহাররাম কে বিশেষভাবে আল্লাহর মাস বলার পিছনে নিশ্চয় কোন কারণ রয়েছে। আর তা হলো এই মাসের বিশেষ ফযীলত ও গুরুত্ব।  উল্লেখ্য যে, চারটি সম্মানিত মাসের মধ্যে সব চেয়ে বেশী গুরুত্ব ও ফযীলত রয়েছে এই মাসের। 

৩. এই মাসের গুরুত্বের আরেকটি কারণ হলে, এই মাসে এমন এক দিন রয়েছে যেদিন সিয়াম পালন করলে আল্লাহ তাআলা এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেন। তা হলো আশুরার দিন অর্থাৎ এই মাসের দশম দিন।

এই মাসে আমাদের করণীয় 

এই মাসে আমাদের করণীয় হলো, শিরক-কুফর থেকে নিয়ে সব ধরণের পাপপচার থেকে নিজেকে দুরে রাখা। আর বেশী বেশী সিয়াম পালন করা। কেউ চাইলে পুরো মাস কিংবা অধিকাংশ দিনে সিয়াম পালন করতে পারে। বিশেষ করে এই মাসের দ্বাদশ তারিখ ‘আশুরা’র সিয়াম পালনের ফযীলত অনেক বেশী। 

আশুরার তাৎপর্য ও ইতিহাস

‘আশুরা’ আরবী শব্দ। এর আখিধানিক অর্থ হল দশম। তা প্রত্যেক মাসের দশ তারিখ হতে পারে। কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় ‘আশুরা’ বলতে শুধু মুহাররাম মাসের দশ তারিখকেই বুঝায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার দিন অর্থাৎ মুহাররামের দশ তারিখে সিয়াম পালনের আদেশ দিয়েছেন। (তিরমিযী) 

ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিনটি অতি উত্তম ও মহান এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। কারণ, 

প্রথমতঃ এই দিনকে হাদীসে অতি উত্তম ও মহান বলা হয়েছে। 

দ্বিতীয়তঃ এই দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে সৈরাচার ফেরআউন ও তার সহযোগীদের থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আর ফেরআউইন কে পানিতে ডুবিয়ে মেরেছেন। 

তৃতীয়তঃ এই দিনে নূহ (আঃ) এর নৌকা জোদী পাহাড়ে অবতরণ করেছিল। 

চতুর্থঃ এই দিনে সিয়াম পালন করলে বিগত এক বছরের পাপ ক্ষমা হয়। 

পঞ্চমঃ রসূল সাঃ সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূন্য অর্জনের জন্য এই দিনের অপেক্ষায় থাকতেন। এছাড়া আল্লাহ তাআলা এই দিনে মুমিনদের কে যুগে যুগে অনেক নেয়ামত দান করেছেন। 

রসূলের জীবনে আশুরা

রসূল সাঃ এর জীবনে আশযরার চারটি অবস্থা দেখা যায়। 

প্রথমঃ হিজরাতের পূর্বে মক্কা শরীফে তিনি আশুরার সিয়াম পালন করতেন। তখন মুশরিকরাও এই সিয়াম পালন করত। 

দ্বিতীয়ঃ মদীনা শরীফে হিজরাতের পর ইহুদীদের কে এই দিনে সিয়াম পালন করতে দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন। তোমরা এটা কি সিয়াম পালন করছো? তারা বললঃ আজকের দিনে আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউন থেকে নাজাত দিয়েছিলেন। তখন মূসা (আঃ) আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে সিয়াম পালন করেছিলেন, তাই আমরাও তাঁর সম্মানার্থে সিয়াম পালন করে থাকি। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ‘নাহনু আহাক্কু বিমূসা মিনকুম’। অর্থাৎ মূসার প্রতি তোমাদের চেয়েও আমাদের অধিকার বেশী। অতঃপর তিনি নিজেও সিয়াম পালন করলেন এবং সবাইকে সিয়াম পালনের আদেশ দিলেন। (বুখারীঃ ১৮৬৫) 

তখন আশুরার সিয়াম পালন ফরজ ছিল। 

তৃতীয়ঃ রমযানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এখন এই সিয়াম ফরজ নয়, বরং ইচ্ছা হলে রাখবে,না হয় রাখবে না। 

চতুর্থঃ জীবনের শেষের দিকে আশুরা উপলক্ষে দুইটা সিয়াম পালন করে ইহুদীদের বিরোধিতার আদেশ দিয়েছেন।

আশুরার সিয়ামের ফযিলত

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (সাঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশুরার দিনের চেয়ে বেশী অন্য কোন দিনে সিয়ামের ফযীলত তালাশ করতে দেখিনি। কদ্রুপ রমযানের চেয়ে বেশী অন্য কোন মাসকে তালাশ করতে দেখিনি। (বুখারীঃ ১৮৬৭) 

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আশুরার দিন সিয়াম পালন করলে আমি আশা করি এক বছরের পাপ ক্ষমা হবে। (মুসলিমঃ ১৯৭৬) 

আশুরার সিয়াম পালনে ইহুদীদের বিরোধিতা

শেষের জীবনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার সিয়াম পালনের বিষয়ে ইহুদীদের বিরোধিতার আদেশ দিয়েছেন। তা এই ভাবে যে হয়ত এক দিন আগেও সিয়াম পালন করবে, অথবা একদিন পরেও সিয়াম পালন করবে। অর্থাৎ ইহুদীদের মত শুধু একটি সিয়াম রাখবে না, বরং দুটি সিয়াম রাখবে। নয়-দশ বা দশ-এগার। 

আব্দুল্লাহ আবনু আব্বাস (রাজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে নয় তারিখেও সিয়াম পালন করব। কিন্তু তিনি পরের বছর সিয়াম পালন করতে পারেন নি। কারণ ইন্তেকাল হয়ে গেছেন। (মুসলিমঃ ১৯১৬) 

এখান থেকে বুঝা যায় যে, রসূল সারা জীবন একটি সিয়াম পালন করলেও শেষের জীবনে তিনি দুইটি সিয়াম পালনের আকাঙ্খা প্রকাশ করেছেন। তাই অন্ততঃ দুইটি সিয়াম মুস্তাহাব। আর দুইটি সিয়াম পালনের বেলায় নয়-দশ তারিখে সিয়াম পালন বেশী উত্তম। কারণ এতে করে দশ তারিখের সিয়ামটি নিশ্চিত হয়ে যায়।

আশুরার সিয়াম পালনের পদ্ধতি

আশুরার সিয়ামের বিষয়ে বর্ণিত হাদসিগুলো দেখলে বুঝে আসে যে, আশুরার সিয়াম পালনের চারটি নিয়ম হতে পারে। 

প্রথমঃ শুধু দশ তারিখের একটি সয়াম পালন করা। 

দ্বিতীয়ঃ দুইটি সিয়াম পালন করা, তবে  নয়-দশ তারিখে। এটা অনেক উত্তম। 

তৃতীয়ঃ দুইটি সিয়াম পালন করা, তবে তা দশ-এগার তারিখে। 

চতুর্থঃ তিনটি সিয়াম পারন করা। অর্থাৎ ৯, ১০, ১১ তারিখে সিয়াম পারন করা। এতে করে ইহুদীদের বিরোধিতাও হবে এবং দশ তারিখের সিয়ামটিও নিশ্চিত হবে। আর মাসে তিনটি সিয়াম পালন করলে পুরো মাস সিয়াম পালনের ছাওয়াবও পাবে।

আশুরার নামে বিদাতী কার্যকলাপ বর্জনীয়     

জ্ঞাতব্য বিষয় হলো, আশুরা পালনের নামে বর্তমান সমাজে অনেক বিদাতী কর্মকান্ড চালু হয়ে গেছে। যেমন, তাজিয়া মিছিল বের কর, হাই হুসাইন বলে নিজেকে আঘাত করে রক্তাক্ত করা, খানা-পিনার মহা আয়োজন করা, আলোক সজ্জা করা, মুহাররাম মাসে বিবাহ শাদীকে অশুভ বা অবৈধ মনে করা, ভালো পোষাক পরে বা অলঙকার দ্বারা সজ্জিত হয়ে বের হওয়া, ইবাদতের এই দিনকে মেলায় পরিণত করা, শোক পালনের নামে কোথাও একত্রিত হয়ে সম্মিলিত ভাবে ক্রন্দন করা বা বিলাপ করা, হাসান-হুসাইনের নামে ফাতেহা-নেয়াজ করা ইত্যাদি সব বর্জনীয়।

শোক পালনের ইসলামী নিয়ম 

অনেকে মনে করে আশুরার চিন্তাটা কারবালার ময়দানে হযরত হুসাইন (রাজিঃ) এর শাহাদাতের পর থেকেই শুরু হয়েছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা। কারণ কারবালার ঘটনার প্রায় ষাট বছর পূর্ব থেকেই আশুরা পালন হয়ে আসছে। স্বয়ং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরা পালন করেছেন। তাঁর পর তাঁর ছাহাবীগন সবাই আশুরা পালন করেছেন। তবে তাদের আশুরা ছিল সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর শুকর আদায় করা। বর্তমানে আশুরার নামে কর্মকান্ডগুলো এক মহান কেয়ামতে পরিনত হয়ে গেছে। ইসলামের সাথে এগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। সব ধরণের বিদাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কড়া হুসিয়ারী উচ্চারণ করে গেছেন। 

কোন ব্যক্তি মারা গেলে ইসলামের দৃষ্টিতে তাঁর জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন জায়েয নেই। আবার তাও শুধু মুত্যুর বছর করা যাবে, পরে নয়। কারণ প্রত্যেক বছর তো তিনি মারা যাচ্ছেন না। শুধুমাত্র মহিলারা তাদের স্বামী মারা গেলে সেই বছর চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।

তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে ইবাদতের এই পবিত্র ও সম্মানিত মাসে বিশেষ করে আশুরার  এই মহান ইবাদতের দিনে সব ধরণের জাহেলী আচরণ ও বিদাতী কর্মকান্ড বাদ দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও সুন্নাতে রসূলের অনুসরণের দিকে ফিরে আসি এবং আল্লাহর পছন্দনীয় নিয়মে আল্লাহর ইবাদত করি।     

ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।

মন্তব্য লিখুন :