রহমতের ছায়ায় মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী এবং দ্যুতিময় জীবন

১৯ মে ২০২০, ১০:৪৮
লাবীব আব্দুল্লাহ

তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক সদরুল মুদাররিসীন৷ খ্যাতিমান হাদীস বিশারদ৷ মুহাদ্দিস৷ ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহর অমর কীর্তি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহর ভাষ্যকার৷

তাঁর ব্যখ্যাগ্রন্থ রাহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআ৷ সহীহুল বুখারীর ব্যখ্যাকারী৷ দরসে হাদীসে তিনি ছিলেন মনি মুক্তো বিতরণকারী৷ হাদীসের জটিল বিষয়গুলো সহজ সরল ভাষায় বয়ান করতেন৷ সবার বোধগম্য ভাষায়৷ তাঁর 'দরসে বুখারী'  গ্রন্থাকারে প্রকাশিত৷

তিনি এই রমজানে তারাবীহর পর নিয়মিত কুরআন মাজীদের তাফসীর শুরু করেছিলেন৷ এই তাফসীরের দরস লাইভে প্রচারিত হচ্ছিল৷ তাফসীরেও তিনি অগাধ জ্ঞান রাখতেন৷ উসূলে তাফসীর বা তাফসীরের মূলনীতির কিতাব আল ফাউজুল কাবীরের আরবী ভার্সন তাঁর অনূদিত৷ ফার্সী থেকে তারীব বা আরবী করেছিলেন যা পাঠ্যভুক্ত৷ তিনি ইলমে ফিকহের মূলনীতিও লিখেছেন৷ 

আধুনিক সমস্যার সমাধান দিতেন ঐতিহ্য রক্ষা করে ও আধুনিক চাহিদা বিবেচনা করে৷ ইফতা বিভাগের জন্য তিনি রচনা করেছেন মূলনীতি৷ তিনি ছিলেন যুগের ফকীহ৷ ইসলামী আইন শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানী৷ আরবী ভাষার ব্যকরণ নাহু ও সরফ বিষয়ে তিনি লিখেন আসান নাহু, আসান সরফ৷ উপমহাদেশে এই বিষয়গুলো পড়ানো হতো ফার্সীতে৷ তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উত্তরপ্রদেশের উর্দু ভাষার কথা বিবেচনা করে মাতৃভাষা উর্দুতে আসান নাহু আসান সরফ উপহার দেন৷ যুগের চাহিদা উপলব্দি করেন৷

দারুল উলূমের প্রবীন অনেক আকাবির উস্তাযের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত এই মনীষী পুরো পৃথিবীর খ্যাতিমান একজন উস্তায৷ উস্তাযুল আসাতিজা৷ তাঁর দরসের বৈশিষ্ট্য ছিলো অনন্য৷ দেওবন্দে ইলমে দীন হাসিল করতে আসা তালেবে ইলমের প্রিয় উস্তায তিনি৷ মিনিট সেকেন্ড হিসাব করে তিনি দরসে হাজির হতেন৷

ইমাম মালিক রহ. এর মতো দরসে হাদীসে পরিচ্ছন্ন পোষাক ও হাদীসের আদব রক্ষা করে দরস দিতেন৷ প্রচলিত প্রথাবিরোধী ছিলেন৷ আসলাফের চিন্তাধারা বিকাশে অবদান রেখেছেন। তবে তাঁর পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা ছিলো৷ তিনি অন্যকে তার চিন্তায় প্রভাবিত করতে পারতেন৷

দেশ বিদেশের সেমিনার ও আলেচনা সভায় অতিথিও হতেন৷ পুরো সাত মহাদেশে তিনি সফর করেছেন৷ তাঁর ফিকহি মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হতো আন্তর্জাতিকভাবে৷ তিনি বিশ্বে স্বীকৃত একজন ফকীহ৷

ব্যক্তি জীবনে আচার আচরণে নববী আখলাকের অধিকারী৷ সাধারণত সাদা জামা পরিধান করতেন৷ ধবধবে সাদা৷ মাথায় রুমালও সাদা৷ চেহারায় ছাপ গাম্ভীর্যতার৷ অভিজাত রুচির অধিকারী৷ সহজেও উত্তেজিত হতেন না৷ রাজনীতির মারপ্যাচে না গিয়ে তিনি ইলম ও তালেবে ইলমের সেবা করেছেন আজীবন৷ ভারতের ক্ষমতার পালাবদলে তিনি কখনও রাজ দরবারে দরবারি আলেমের ভূমিকা নেননি৷ ক্ষমতার জায়েয-নাজায়েয সুবিধা নেননি৷ নেবার চেষ্টাও করেননি৷ নীরব সাধাক সেই সলফে সালেহীনের  নমুনা তিনি৷ প্রথাগত ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে জীবনের সময় নষ্ট করেননি৷ তবে আলেম ওলামাদের নিকনির্দেশনামূলক বয়ান করতেন৷ আলেমদের পথিকৃত তিনি৷ 

তিনি দারুল উলুমের মতো আন্তর্জাতিক দীনি দূর্গের সেনাপতি হয়েও হালাল আয়ের জন্য নিজে দোকানে বসে দোকানদারি করতেন৷ কিতাব ও বইয়ের ব্যবসা৷ যাকাত ফিতরা বা মাদরাসার অজিফার দিকে না তাকিয়ে নিজে দোকানদারি করে জীবন নির্বাহ করতেন৷ নিজে লিখতেন৷ মুদ্রণ করে নিজেই বিপনন করতেন৷ নিজ সন্তানদেরকে দোকানে কাজ করিয়ে ব্যবসায়ী মানসিকতার বানাতেন এবং ভাতা দিতেন৷ ইলমে দীন যেন ব্যবসার মাধ্যম না হয় তার প্রতি তিনি সজাগ ছিলেন৷ তিনি প্রকাশক ছিলেন৷ নিজের লেখা কিতাবগুলো নিজেই প্রকাশ করে বিক্রি করে হালাল আয়ে জীবন পরিচালনা করেছেন৷ জীবন নির্বাহে এক সময় বেতন ভাতা নিলেও তিনি সচ্ছল হয়ে সেই টাকা দান হিসেবে বা অণ্য হিসেবে ফেরৎ দেন৷ সম্ভবত অবৈতনিক ছিলেন শেষ জীবনে৷

শেষ জীবনের দিনগুলোতে তিনি ডিজিটাল গণমাধ্যম হিসেবে ফেসবুকে লাইভ তাফসীর ও নানা ফিকহি জিজ্ঞাসার জবাব দিতেন তবে অডিও লাইভ৷ তিনি সম্ভবত ভিডিও লাইভ বর্জন করতেন ছবি সংক্রান্ত দেওবন্দের চিন্তার কারণে৷ তিনি বয়ানে আলোচনায় ইংরেজি শব্দও চয়ণ করতেন যুগের ভাষা হিসেবে৷ প্রাচীন চিন্তাধারার হয়েও আধুনিক ভালো দিকগুলো গ্রহণ করতেন শরঈ  উসূল ও মানদন্ড রক্ষা করে৷

তাকওয়া তাহরতে মুআমালা মুআশারায় তিনি হাদীসে বিবৃত নববী চরিত্রের বাস্তব চিত্র ছিলেন মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরি৷ ভারতে পালনপুরে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এই মনীষীর জন্ম৷ দেওবন্দের ছাত্র৷ দেওবন্দেই তিনি শাইখুল হাদীস ও প্রধান শিক্ষক৷ প্রতিভাধর আলেম৷ যুগশ্রেষ্ট ফকীহর বিদায়ে পৃথিবী এরজন আলেম রব্বানী ও ইসলামী আইনের ভাষ্যকার ফকীহকে হারালো৷ এই শূন্যতা দারুল উলূম দেওবন্দে অপুরণীয়৷ 

আমার সৌভাগ্য এই মনীষীর বয়ান আলোচনা একাধিকবার শুনার সুযোগ হয়েছে৷ মুসাফাহা ও কিছুক্ষণ কাছে বসে সান্নিধ্যের দ্যুতিতে আলোড়িত হবার সুযোগ হয়েছে৷

এই রমজানে তারাবীহ পর ডিজিটাল যুগের সুযোগে লাইভ তাফসীর ও সওয়াল জওয়াব পর্বগুলো থেকে উপকৃত হয়েছি৷ যুগের তরুণ আলেম তাঁর জীবনের অনন্য বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে পারেন৷

কুরআন নাজিলের মাসে তিনি আশ্রয় নিলেন রহমতের ছায়ায়৷ ১৯ মে ২০২০ মুতাবেক ২৫ রামাযান ১৪৪১ হিজরী সকালে এই দীনের এই সূর্যের অস্ত হয়৷ সূর্য উদয়ের সময় দীনের সূর্যের অস্ত৷ করোনাকালে উদয় অস্তে ঠিক নেই৷ উদয় অস্তের এই পৃথিবীর প্রদীপ্ত সূর্যও প্রভাহীন হয়ে এরদিন৷ পৃথিবীতে প্রয়োজন আল্লামা পালনপুরীর মতো দীনের সূর্য৷ এই সূর্য পূব পশ্চিমে ইসলামের আলো ছড়াবে৷ সেই সূর্যের উদয় কামনা করি আল্লাহর সমীপে৷ তরুণ তুমিও সূর্য হও৷


লাবীব আব্দুল্লাহইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ

মন্তব্য লিখুন :