নওগাঁয় ফি দিয়ে কোভিড-১৯ নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ কমেছে

২৭ জুলাই ২০২০, ১৫:১৪
নওগাঁ প্রতিনিধি

ফি দিয়ে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নমুনা সংগ্রহ শুরুর পর থেকে নওগাঁয় মানুষের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া ফি দিয়ে নমুনা দেওয়ায় হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জন্য অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। মানুষ এখন একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নমুনা দিচ্ছেন না। সরকারের সুদৃষ্টি কামনায় ফ্রিতে (মাগনা) নমুনা সংগ্রহসহ জেলায় পিসিআর ল্যাব স্থাপনের দাবী জানানো হয়েছে।

সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় গত ৩ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭ টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সে হিসাবে দিনে গড়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১০৬ দশমিক ৭৮টি। গত ১ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ফি দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ টি। অর্থাৎ দিনে গড়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৭৬ দশমিক ১৪টি।

করোনা ভাইরাস শুরুর পর থেকেই গোটা বিশ্ব আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। কয়েকটি দেশ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিলে আশা দেখা যায়। অবশ্য এখন পর্যন্ত বাজারে ভ্যাকসিন না আসায় শঙ্কাও রয়েছে। এদিকে এক সময় করোনাভাইরাসের নমুনা দেওয়ার জন্য দেশের হাসপাতালের করোনা ইউনিটগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়তো। প্রয়োজন ছাড়াও একাধিকবার অনেকে নমুনা দিয়েছেন। কিন্তু ফি দিয়ে নমুনা সংগ্রহের পর থেকে অনেকটা চাপ কমে গেছে। ফি নির্ধারণ করার পর থেকে নিম্নবিত্ত ও সাধারণদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতনরা।

নওগাঁ সদর উপজেলার রজাকপুর গ্রামের গৃহবধু সুমাইয়া আক্তার জানান, তার স্বামী মাইক্রোবাসের চালক। বাইরে থেকে আসার পর সচেতনতার জন্য পোশাক অন্য ঘরে রাখেন বা নিজেই পরিস্কার করে নেন। সুমাইয়া আক্তার বলেন, স্বামীর কয়েক দিন থেকে সর্দি। মুখে স্বাদ নেই। কী খাচ্ছেন তার গন্ধ পাচ্ছেন না। হেল্পলাইনে ফোন দিয়ে পরামর্শ চাইলে তরকারি হিসেবে কাচাকলা, সি সমৃদ্ধ খাবার ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স খেতে বলা হয়। এরমধ্যে ছেলেমেয়ের জেদে স্বামীকে বাড়িতে রেখে বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ৩-৪ দিন ছিলাম। বাড়িতে আসার পর গ্রামের লোকজন ভেবেছে স্বামীর করোনাভাইরাস হয়েছে। বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হবে বলে হুমকি এসেছে। নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে। সমাজে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নওগাঁর সভাপতি মহসিন রেজা বলেন, পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে রাষ্ট্র টাকা নিয়ে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা  করে। যেটা বাংলাদেশে হচ্ছে। জেলায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস। যেহেতু গড়ে ৭৬টি নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাহলে নমুনা সংগ্রহ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যারা সাধারণ কর্মজীবি ও দিনমজুর তাদের ২০০ টাকা জমা দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা কষ্টকর। এজন্য নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া যখন ফ্রিতে (মাগনা) নমুনা সংগ্রহ করা হতো তখনও সাধারণ মানুষের দিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজর কম ছিল। যখন আবার টাকা দিয়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু হলো  তখন গুরুত্ব আরো কমে গেছে ।

তিনি বলেন, সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা মনে করছেন করোনা পজেটিভ। কিন্তু টাকার অভাবে নমুনা দিতে পরাছেন না। এ ছাড়া বিষয়টি প্রচার হলে সামাজিক ভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। তারা নমুনা দিচ্ছেন না। আবারো ফ্রিতে (মাগনা) নমুনা সংগ্রহ করা হোক। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব হেলথ কমপ্লেক্স আছে সেখানে নমুনা সংগ্রহ করা উচিত। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে অবশ্যই পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা উচিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নওগাঁ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন নবী বেলাল বলেন, আসলে বাঙালি মাগনা পেলে আলকাতরাও খায়। কথাটা মহামারী করোনা ভাইরাস টেস্টেও প্রমাণ হলো। স্বাভাবিকভাবে ঋতু পরিবর্তনের সময় অনেকের জ্বর, সর্দি ও কাশি হয়। আর এসময় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই জ্বর হলেই জনগন ফ্রিতে করোনা টেস্ট করাতেন। সরকার করোনা টেস্টে ২শ-৫শ টাকা ফি নির্ধারণ করার পর থেকে চাপ কমলেও গরীব-অসহায়দের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি ডাক্তারের পরামর্শে টেস্ট করানো হতো তাহলে ঝামেলা কম হবে। সরকার স্বাস্থ্যখাতে অনেক ভুর্তুকি দিয়েছে। নির্ধারিত ফি মওকুফের জন্য সরকারের শুভদৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ করছি। সরকার ইচ্ছে করলেই করোনা পরীক্ষা ফ্রি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

নওগাঁ ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মঞ্জুর-এ-মোর্শেদ বলেন, ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠিয়ে করোনা পরীক্ষা করা হয়। কিছুদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে চাপের কারণে পুনরায় ঢাকা থেকে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ফি দিয়ে নমুনা সংগ্রহের আগে অনেকের দরকার নেই, কিন্তু তারপরও নমুনা দিয়েছেন। কিন্তু ফি দিয়ে নমুনা সংগ্রহ শুরুর পর থেকে যাদের একান্ত প্রয়োজন মুলত তারাই নমুনা দিচ্ছেন। এতে দেখা গেছে বিগত দিনের তুলনায় বর্তমানে নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ কমে গেছে।

মন্তব্য লিখুন :