করোনায় বদলে যাওয়া ঘরবন্দি শিশুরা

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৭
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
করোনার সময়ে ঘরবন্দি আদৃতা নিজের ভুবন খুঁজে নিয়েছে

এ বছর স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সুবাইতা সারার। রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন প্রিপারেটরি স্কুলে। কিন্তু শিক্ষক আর বন্ধুদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠতে না উঠতেই মহামারী করোনার ছোবলে ঘরবন্দি সে। চিকিৎসক বাবা-মায়ের সার্বক্ষণিক যত্ন ও সঙ্গে এখন দিন কাটে তার।  

সামগ্রিক করোনাভাইরাস মহামারীতে কয়েক মাসের ঘরবন্দি জীবনে সুবাইতার মতো শিশুরা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছে বলে জানান অভিভাবকরা। একইসঙ্গে মনোবিদ ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, অস্বাভাবিক এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কঠিন এই সময়ে শিশুদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অভিভাবকদের বেশি মনোযোগী ও যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ছোঁয়াচে এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশেও গত মার্চ থেকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ; কবে তা খুলবে তারো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে চাইলেও তাতে অনভ্যস্ত শিশুরা এমনকি অভিভাবকরাও।

সুবাইতার মা ডা. ফৌজিয়া জাহান জানান, সপ্তাহে ছয় দিন অনলাইনে এক ঘণ্টা করে ক্লাস হয় তার ছেলের। কিন্তু এ সময়টায় অনলাইনে তাকে রাখাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, প্রথম প্রথম বোঝানো যেত, এখন একেবারেই মানতে চাচ্ছে না। অনলাইনে ক্লাস করাতে হচ্ছে জোর করে। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাস করবে।’

এ চিকিৎসক বলেন, সব বাচ্চা তো আসলে এক না। স্কুলে থাকতে শিক্ষক যা পড়াতেন, সব শিখে যেত বাসা থেকে। হোমওয়ার্ক করত নিজে নিজেই। কিন্তু এখন বাসায় পড়ালে সে মনোযোগ দিতে পারছে না, শিখতেও পারছে না।

একই সমস্যার কথা জানান ফাতেমা খান। তার দুই ছেলে রনক ও কনক মিরপুরের প্যারাডাইস কিন্ডারগার্টেন ও হাই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ফাতেমা খান বলেন, অনেকদিন ধরে ছেলে দুটি ঘরবন্দি, কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। স্কুলে খুব যেতে চায়। একদিন টিচারকে ফোন করে কান্না করেছে স্কুল খুলে দেওয়ার জন্য। ওরা খেলাধুলা করতে পারে না, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারে না, এসব বলেছে। পরে টিচার বুঝিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাসায় বেশিরভাগ সময়ই কার্টুন, মোবাইলে গেমস খেলতে চায়। পড়াতে হয় জোর করে। পড়াশুনায় আগের মতো আগ্রহ, মনোযোগ কোনোটাই নেই। ওদের সপ্তাহে একদিন অনলাইনে ক্লাস হয়, এতে আসলে তেমন কোনো লাভ হয় না।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া হাসানের মা নাজনীন হাসান বলেন, আমরা বাচ্চাদের নিরাপদ রাখতে বাসায় রাখছি। কিন্তু এতে সে জেলখানার মতো বন্দি হয়ে গেছে। সে বাইরে বেরুতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চায়, স্কুলে যেতে চায়, মাঠে খেলতে চায়। কিন্তু সেটা তো এখন সম্ভব না। নানাকিছু দিয়ে ওকে বোঝাচ্ছি। কিন্তু কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় শিশুদের সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, একটি শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবার, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাগ্রহণের পাশাপাশি তার কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে সে শিক্ষা পায় এখান থেকেই। তবে যেই ক্রান্তিকাল আমরা অতিক্রম করছি, তা শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য অন্তরায়।

শিশুদের মানসিক বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য নতুন নতুন কৌশল খুঁজে বের করার জন্য অভিভাবকদের তাগিদ দিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক এই পরিচালক বলেন, মা-বাবারা এ বিষয়গুলোতে যদি সচেতন হয়, তাদের বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। মেধা ও প্রযুক্তির দিক থেকে সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিলুফার আক্তার জাহান মনে করেন, নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। শিশুরা অনলাইনে ক্লাস না করে ঘরে বসে থাকলে সেটি আরো বেশি ক্ষতিকর হত বলে মনে করেন তিনি। 

অধ্যাপক নিলুফার বলেন, আরেকটি বিষয় হচ্ছে, তাদের চিন্তার জায়গাটায় পজিটিভ বিষয় থাকতে হবে। প্রতিদিন তারা করোনাভাইরাসের বিষয় সচেতন হওয়ার জন্য জানবে, কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য। খুব বেশি জানা শুরু করলে মানসিক চাপ বাড়বে। চিন্তাধারায় বদল এনে পজিটিভ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম বলেন, শিশুর সামাজিকীকরণটা মূলত শুরু হয় বাসা থেকে। স্কুলে পাঠদানের ফলে সেটা আরও বিকাশ লাভ করে, সে জায়গাটায় ক্ষতি তো হবেই। তবে এই সময়টায় পরিবার থেকে যদি শিশুর প্রতি যত্নবান হওয়া যায়, তবে এই ক্ষতিটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন এই সংকটকালে কিশোর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক সময় বাবা-মারা বলেন, তারা বাচ্চাদের বন্ধু। কিন্তু এটা কখনোই হয় না। বন্ধু হলে সেটা সমবয়সী কেউ হতে হয়। কারণ সমবয়স হলে একে অপরের সঙ্গে একটা বিষয় শেয়ার করার ফলে শেখা হয়। বাচ্চারা যখন বাসায় থাকছে, তখন তারা বড়দের সঙ্গে বা ছোটদের সাথে সময় কাটাচ্ছে। তারা সমবয়সীদের পাচ্ছে না, এতে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি একইসঙ্গে বলেন, শুধু নেতিবাচক দিকই আমি বলব না। কিছু বাচ্চা হয়ত ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। তবে বন্যা হলে যেমন পলিমাটি দিয়ে যায়, সেটা সারের কাজ করে; ঠিক তেমনি বাচ্চারা যখন বিপদে পড়ে, কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়, তখন নিজস্ব সামর্থ্যরে মাধ্যমে তারা তা রিকভারি করে যায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ মনে করেন, প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুটো দিক থাকলেও মহামারীকালে শিশুদের নাগালে প্রযুক্তি আসায় তা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথে সম্ভাবনাও হতে পারে।

অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, শিশুদের ইতিবাচক সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের হাতে ডিভাইস চলে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই আছে। কিন্তু অভিভাবকদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা ‘এডুকো’র বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ বলেন, ‘শিশুরা তাদের চারপাশে কী ঘটছে এবং পরিবারের ওপর এই পরিস্থিতির প্রভাব কী সে সম্পর্কে সচেতন। যদিও এই মহামারির মূখ্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী হিসেবে শিশুদের বিবেচনা করা হয় না, তথাপি অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা জানি যে এ জাতীয় অর্থনৈতিক সংকট তাদের আবেগ এবং মানসিক সুস্থতার ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

শিশু সুরক্ষা টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ডস’র কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ এহসানুল হক বলেন, ‘এই সমস্ত ফলাফলের মাধ্যমে শিশুদের জীবনে বন্ধুত্ব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে গুরুত্ব রয়েছে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ স্কুল কেবল এমন জায়গা নয় যেখানে শিশুরা শুধুই লেখাপড়া করতে যায় বরং এটি একটি সম্পর্ক, বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিগত বিকাশেরও জায়গা যার মাধ্যমে তারা সামগ্রিকভাবে তাদের উন্নয়নের সুযোগ পায়।’

মন্তব্য লিখুন :