সৌদি প্রবাসীদের সড়ক অবরোধ ও প্রবাসী কল্যাণ ভবন ঘেরাও

সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:৪৮
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
সৌদি আরবে ফেরার টিকিট না পেয়ে বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা গতকাল ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ ভবন ঘেরাও করেন-ছবি সংগৃহীত

সৌদি আরবে ফেরার টিকিট না পেয়ে বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা বুধবারও বিক্ষোভ করেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সড়ক অবরোধ করার পর ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ ভবন ঘেরাও করেন তারা। এ সময় তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরেন।

তারা বলেন, এ মাসের মধ্যে সৌদি আরব যেতে না পারলে অনেকেই চাকরি হারাবেন। তাদের দ্রুত ফেরার ব্যবস্থা করা জরুরি। ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সেখানে যাওয়ার জন্য তাদের টিকিটও লাগবে। 

এদিকে বিক্ষুব্ধ সৌদিপ্রবাসীদের কাছে আগামী সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সৌদি আরব এখনো সেদেশে ফ্লাইট পুনরায় চালু করার অনুমতি দেয়নি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে। 

এর মাঝেই টিকিট না পেয়ে গত কয়েক দিন ধরেই মতিঝিলে বিমান অফিসের সামনে এবং কারওয়ান বাজারে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেন সৌদি ফিরতে আগ্রহীরা।

এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার সকাল ৯টার দিকে কয়েকশ প্রবাসী কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে সড়কে অবস্থান নেন। এতে কিছু সময়ের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

পরে বেলা ১১টার দিকে তারা ইস্কাটনে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। তাদের আরেকটি দল বেলা ১২টার দিকে মতিঝিল থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সৌদি প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে, যাতে তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এর সুরাহা করে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রবাসীদের অনেকে জানান, তাদের অনেকেই মার্চে মহামারীর শুরুতে দেশে আসার পর আ ফিরতে পারেননি। এখন ফেরার জন্য তারা ফ্লাইট পাচ্ছেন না। কারো কারো হাতে রিটার্ন টিকেট থাকলেও বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। এ মাসের মধ্যে ফিরতে না পারলে চাকরি চলে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন তারা।

তারা জানান, প্রবাসীদের যাদের হাতে রিটার্ন টিকিট আছে, তার বেশিরভাগই বিমানের। কিন্তু বিমান সৌদি আরবে নামার অনুমতি পাচ্ছে না। 

প্রবাসী তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রধান দাবি হলো ইকামা। ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয় দাবি হলো, আমরা অনেকেই রিটার্ন টিকিট নিয়ে এসেছি। আমরা যেন সেই টিকিটে ফিরে যেতে পারি। তৃতীয় দাবি হলো, আমাদের টিকিটের মূল্য যেন বেশি রাখা না হয়। অন্যান্য এয়ারলাইনস যেন হয়রানি না করে।’ 

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার রুবায়েত জামান সর্বশেষ জানান, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। রুবায়েত জামান বলেন, সৌদি এয়ারলাইনসের চলতি মাসে ৪টি ফ্লাইটে ১ হাজার ৬০টি টিকিট ছিল, যার সবই বিক্রি হয়ে গেছে। বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সৌদি আরবে ল্যান্ডিং অনুমতি পেলে আগামী ১ অক্টোবর থেকে সৌদি আরবে তারা সপ্তাহে আটটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। 

রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে প্রবাসিরা অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেছেন। কোনো ধরনের গ-গোল হয়নি বলে জানান তিনি। 

শাহবাগ থানার পরিদর্শক (পেট্রোল) আবুল বাশার বলেন, প্রবাসীদের একটি দল মিছিল করে এসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। পরে তাদের তিনজন মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করে সচিবের সঙ্গে কথা বলেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান বলেন, সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সকে এই শর্তে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সও সে দেশে যেতে পারবে। কিন্তু বিমানকে এখনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বিমান যেন সৌদিতে ফ্লাইট চালাতে পারে, সেজন্য সর্বাত্তক চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান মফিদুল।

তিনি বলেন, আমাদের দেশি কিছু এজেন্সি টিকেট ব্লক করে ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা আমাদের প্রবাসীদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (এমডি) প্রধান নির্বাহী (সিইও) মোকাব্বির হোসেন বলেন, বিমানকে আটটি ফ্লাইটের স্লট দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ল্যান্ডিং পারমিশন দেয়নি। পারমিশন মিললেই ফ্লাইট চালু করতে পারব।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মহিবুল হক বলেন, ‘আমরা প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছি। আর সৌদি এয়ারলাইনস যদি আমাদের কাছে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর আবেদন করে, তবে আমরা তা দিয়ে দেব। কিন্তু তারা ফ্লাইট বাড়ানোর আবেদনই করেনি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন জানান, বাংলাদেশের অনেকের সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ভিসা ও ইকামা রয়েছে। কিন্তু যেতে পারছেন না। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়েছে বুধবার। মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বৈঠকে সৌদি আরবে লোক পাঠানো প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। প্রবাসীদের দাবি ছিল তারা যদি এখন না যেতে পারে তবে তাদের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে। আমরা সৌদি সরকারের কাছে মঙ্গলবার অনুরোধ করেছি, তিন মাস তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এবং যাতে এই সুবিধা বিনা খরচে পায়।’

তিনি বলেন, ‘সৌদি এয়ারলাইন্স যতগুলো অনুমতি চেয়েছে সব অনুমতি দিয়েছি যাতে করে সহজে যেতে পারে। এ ছাড়া বিমান তৈরি আছে। যে মুহূর্তে ল্যান্ডিং রাইট পাবে, তখনই ফ্লাইট চলাচল শুরু করবে।’

প্রবাসীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি সরকার আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে অত্যন্ত কড়া। যদি আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কাজ বা জটলা দেখানো হয় তবে এটি তারা বরদাস্ত করে না।’

তিনি বলেন, ‘তারা এখানকার বিষয়গুলো অবলোকন করছে। টেলিভিশন মিডিয়াতে যা দেখানো হচ্ছে সেটি স্টাডি করছে। আমাদের ভয় হলো, তারা যদি দেখে আন্দোলনকারীরা জটলা করছে, তবে হয়তো তাদের ভিসা বাতিল করে দেবে কিংবা কাজ বাতিল করে দেবে। এ বিষয়ে তারা খুব শক্ত। তারা যদি বাতিল করে তবে আমাদের কিছু করার নাই। প্রবাসীরাই তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগেও এ ধরনের ঘটনা হয়েছে।’

সাত বছর পরে সৌদি আরব আবার লোক নেওয়া শুরু করেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এই অবস্থায় আমাদের প্রতি তারা বিরূপ ধারণা পেলে প্রবাসীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী : বিক্ষুব্ধ সৌদিপ্রবাসীদের কাছে আগামী সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ। সৌদিপ্রবাসীদের ছয় প্রতিনিধির সঙ্গে বুধবার দুপুরের দিকে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান ইমরান আহমদ।

বুধবার বেলা একটার দিকে সৌদিপ্রবাসীদের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যায়। আলোচনা শেষে বেলা দেড়টার দিকে তারা বাইরে বেরিয়ে আসে।

পরে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সৌদিপ্রবাসীদের কাছে তিনি সোমবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। তাদের সমস্যার বিষয়ে তখন আপডেট জানাবেন।

মহামারীতে দীর্ঘদিন আকাশপথ বন্ধ রাখার পর সৌদি আরব সরকার ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর অনুমতি দেয়। সে অনুযায়ী সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট চালানোর অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু এ মাসের সব টিকেট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় আর কেউ টিকেট পাচ্ছেন না।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যে এক হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিটেন্স দেশে এসেছে, তার মধ্যে ৪০১ কোটি ৫১ লাখ ডলারই সৌদি প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন।


মন্তব্য লিখুন :