ঢাকার বস্তিতে করোনা ছড়াচ্ছে না!

২৬ জুলাই ২০২০, ১৮:২৩
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
কড়াইল বস্তি-ফাইল ছবি

সারাবিশ্বে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) যখন মহামারী রূপে আছে; তখন রাজধানীর বস্তিগুলোতে করোনা রোগি তেমন নেই। আশ্চর্য হলেও এমনটিই হয়েছে। মজার বিষয়, কয়েক দশক ধরে পাওয়া বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে- বস্তিবাসীরা যেকোনো রোগে অসুস্থ হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন! আরো মজার বিষয়, রাজধানীর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মহাখালি ও মিরপুরের  বস্তিগুলোতেও করোনা রোগি নেই।  

অথচ চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি দেশে আঘাত হানার শুরুর দিকে মহামারির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার আশঙ্কা ছিল রাজধানীর ২০টি বস্তি। জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব ছাড়াও একই রান্নাঘর, টয়লেট, পানির উৎস অনেকে মিলে ব্যবহার, ঠাসাঠাসি করে এক ঘরে পরিবারের সবাই থাকা, খোলা নর্দমা, অস্তিত্বহীন বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বস্তিবাসীদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা তাদের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী দেশে করোনা সংক্রমণের চার মাসেরও বেশি সময় পর কোনো বস্তি করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। 

সম্প্রতি কড়াইল, চলন্তিকা, ভাষানটেক, বাউনিয়াবাঁধ, আবুলের বস্তি ও লালাসরাইয়ের বস্তি ঘুরে দেখা গেছে বস্তির বাসিন্দারা করোনা নিয়ে ভীত নন। একইসঙ্গে বস্তিগুলোতে করোনা রোগির সন্ধানও পাওয়া যায়নি। সবগুলো বস্তিতে একটি ‘কমন’ কথা শুনা গেছে- ‘এই বস্তিতে কোনো করোনা রোগি নাই। এটা ধনীদের রোগ।’ তারা কথাগুলি এমন জোর দিয়ে বলেন যেন এটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে প্রমাণিত এবং সর্বজনবিদিত সত্য।

তবে, সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর বিষয় হল- বস্তিবাসীদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ হচ্ছে না? নাকি পরীক্ষার অভাবে তা শনাক্ত হচ্ছে না?

কড়াইল বস্তিতে বসবাসরত ৪০ বছর বয়সী গৃহকর্মী কামরুন্নাহার মাস্ক ব্যবহার করেন না। তিনি মনে করেন দেশে কোনো করোনাভাইরাস নেই। করোনাভাইরাসের কারণে কাজ হারানো এই নারী বলেন, রাতে কী খাবো, সেটা নিয়ে আগে ভাবি। মাস্কের কথা পরে ভাবা যাবে।

কড়াইল বস্তি উন্নয়ন কমিটির বউবাজার ইউনিটের চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান বলেন, মানুষ এখন আর আগের মতো অসুস্থ হচ্ছে না। ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বস্তিবাসীদের কথাই প্রতিধ্বনিত করেন, ‘এখানে সংক্রমণের হার খুবই কম।’

ভাষানটেকের একটি ওষুধের দোকানের স্বত্বাধিকারী কৃষ্ণ দে জানান, তিনি প্রচুর পরিমাণে ফ্লুর ওষুধ বিক্রি করছেন। তবে, সেখানকার বাসিন্দাদের কেউ কখনো করোনা পরীক্ষার করানোর জন্য চেষ্টাও করেননি। তিনি বলেন, এই বস্তিতে আমাদের কারো করোনার সংক্রমণ আছে কি না, আমরা জানি না।

চলন্তিকা ও অন্যান্য বস্তির বেশ কয়েকটি ওষুধের দোকানের মালিক ও কর্মচারীরাও একই কথা জানিয়েছেন। চলন্তিকা বস্তির বায়তুল নূর জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন জানান, তিন সপ্তাহ আগে বস্তিতে হঠাৎ একজন বৃদ্ধ মারা যান। তার কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি বলেন, সবাই বলছিল যে তিনি বৃদ্ধ বয়সে মারা গেছেন। তার করোনা পরীক্ষার দরকার নেই।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী শিপ্রা রানী মৃধা জানান, বস্তিবাসীদের মধ্যে থাকা ভুল তথ্য ও কুসংস্কারই আসল চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়েছে তার কাছে। তিনি বলেন, আমি জ্বরে আক্রান্ত কয়েকজনের নাম সংগ্রহ করেছিলাম যাতে তাদের পরীক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ে সাহায্য করতে পারি। নাম নিয়ে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরই তাদের পরিবারের সদস্যরা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাদের অনুরোধ, আমি যেন জ্বরে আক্রান্তদের কথা কাউকে না জানাই। তাদের ভেতর ভয় ছিল যে তাদের বহিরাগত বলে মনে করা হচ্ছে বা পুলিশ  গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেছিল যে তারা শুনেছেন কোয়ারেন্টিনে নিয়ে রোগীদের মেরে ফেলা হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যারা মাটির সঙ্গে সংযুক্ত থেকে খোলামেলা রোদে বা বাতাসে কাজ করেন, শারীরিক শ্রম বেশি দেন তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্তের প্রকোপ কম। এর নির্ণায়কগুলো হলো, শারীরিক শ্রম, রোদে কাজ করা, খোলা বাতাস এগুলো দিয়ে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। একইসঙ্গে এরা ফ্রিজে রাখা বা সংরক্ষিত খাবার কম খান। এই নির্ণায়কগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, যারা শীতাতপ জায়গায় বেশি থাকেন এবং যারা খোলা রোদে একেবারেই কম যান, খালি পায়ে কম হাঁটেন, সংরক্ষিত খাবার বেশি খান এবং কৃত্রিম আলোতে দিনের বেশিরভাগ সময় থাকেন, তাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাদের কোভিড-১৯ বেশি আক্রমণ করছে। এটা শুধু কোভিড-১৯ এর জন্য না, সমস্ত ভাইরাসের জন্যই প্রযোজ্য।’

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কম-বেশি সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না; তবে বস্তি এলাকার জনসংখ্যার ডেমোগ্রাফিক পিরামিড হচ্ছে- সেখানে যুবক-তরুণদের সংখ্যা বেশি, বৃদ্ধরা গ্রামে থাকে। যার কারণে তারা আক্রান্ত হলেও তা তুলনামূলকভাবে কম হচ্ছে।’ তবে আক্রান্ত অবশ্যই হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মৃদু লক্ষণে তারা গা করে না, পাত্তা দেয় না। তবে ফ্যাটাল কেস না যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ বয়স এখানে কম। আর বিশেষ করে এই করোনার সময় সবল, কাজ করতে পারে, বয়স কম তারাই ঢাকায় টিকে রয়েছে। সিনিয়র পপুলেশন এখন ঢাকায় নেই, যার কারণে মৃত্যু সংখ্যা কম ওখানে।’

২১ জুলাই আইইডিসিআরের পরিচালক মীরাজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আমরা রাজধানীর বস্তিবাসীদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছি। সেখানে সংক্রমণের হার বেশি দেখছি না। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বস্তিতে যদি করোনার প্রকোপ অন্যান্য জায়গার মতো হতো, তাহলে অনেক মানুষ মারা যেতো। কারণ এমনিতেই বস্তিগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতাও কম।’ বস্তিতে করোনার প্রকোপ নেই কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ সম্পর্কে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কেন এমন হচ্ছে। গবেষণা করে কতজন পজিটিভ আর নেগেটিভ, সেটা বের করে দেখা যেতে পারে। কেন এমন হলো সেটাও গবেষণা করা জরুরি।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘বস্তির মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু হয়তো শনাক্ত হচ্ছেন না। করোনাতে যারা আক্রান্ত হন তাদের মধ্যে শতকরা ৮০ শতাংশেরই লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। আবার যারা কর্মঠ তারা হালকা সর্দি কাশি হলে বলেনও না। সচেতনতার অভাবে সেটা আমলে নেন না। সবকিছু মিলিয়ে কম বলা যাবে না। হয়তো আমরা খবর পাচ্ছি কম। আক্রান্ত কম এটা বলতে আমাদের স্টাডি করা লাগবে। কিন্তু এ ভাইরাসের যে চরিত্র তাতে করে বেশি হওয়া ছাড়া কম হওয়ার কোনো যুক্তি নাই।’

মন্তব্য লিখুন :