করোনা পরিস্থিতি

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপেক্ষা

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:১৯
অনুসন্ধান প্রতিবেদক

সামনের শীতে দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মত, সংক্রমণের এই সময়ে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়াতে সংক্রমণের হার আরো বাড়বে। আর তা ঠেকাতে হলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা এও বলছেন সরকার তাদের পরামর্শ পুরোপুরি শুনেনি। 

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন সংক্রমণের গতি কমানো, নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো ও রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার অনেকটাই বাস্তবায়ন করা যায়নি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবর দাবি করা হয়েছে, মহামারি মোকাবেলায় প্রতিবেশি অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো।

এর মাঝেই দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (৭ সেপ্টেম্বর) করোনায় ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত করোনায় ৪ হাজার ৫১৬ জনের মৃত্যূ হলো। এই সময়ে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২০২ জন। মোট শনাক্ত হলেন ৩ লাখ ২৭ হাজার ৫৭৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ১৮ মার্চ প্রথম করোনায় মৃত্যুর খবর দেয় অধিদফতর। সেই হিসেবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঠিক ছয় মাসের মাথায় মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে চার হাজার ছাড়ালো।

অধিদফতরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে এখন সক্রিয় করোনা রোগী আছে ৯৮ হাজার ২৭০ জন।

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে ৩১ মে তা তুলে নেওয়া হয়। তারপর থেকেই করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। অথচ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, বন্ধ হয়ে যাওয়া বুলেটিন চালু করা, টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো, কার্যকর লকডাউনের মতো অনেক পরামর্শ বিশেষজ্ঞরা দিলেও সেদিকে নজর নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বাঁচতে হলে নিজেদেরই সচেতন হতে হবে। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অথবা অধিদফতর তাদের কথা শুনছে না।

করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত আয়োজন সংবাদ বুলেটিন বন্ধ করে দেওয়া হয় পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে, তাই প্রতিদিন আর বুলেটিনের দরকার নেই।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস পৃথিবীর চিত্র পাল্টে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে গত ১১ মার্চ মহামারি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংক্রমণ ঠেকাতে নানা দেশে আরোপ করা হয় কঠোর লকডাউন। তারপরও ঠেকানো যায়নি এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় দাস মনে করেন, মহামারি যখন আসে তখন মহামারি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়েই মূল কাজ করতে হয়, তাদের আমলে নিয়ে, তাদের মতামত- তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে হয়। চিন্ময় দাস বলেন, সংক্রমণ যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য চেষ্টা করতে হবে, একথা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকে বারবার বলেছেন। কিন্তু সংক্রমণ কমেছে বা নিয়ন্ত্রণে এসেছে-মন্ত্রণালয়ের একথা ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু না। আর কোনো কারণে যদি নতুন করে ‘বার্স্ট আউট’ হয়, তাহলে তার জন্য আমাদের ‘পে’ করতে হবে, তবে আমি জানি না তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে কি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা মনে করেন, নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার ফলেই কমে যাচ্ছে পরীক্ষার হার। তিনি বলেন, নমুনা পরীক্ষা না করেই ভুয়া ফলাফল প্রকাশের যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, তার ফলে এখন পরীক্ষার ওপরই মানুষের মধ্যে এক ধরণের আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও, কারণ হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার ফলে মানুষ এখন হাসপাতালে যেতে চাইছে না।

অধ্যাপক সুলতানা মনে করেন, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে কঠোরভাবে পরিস্থিতি মনিটরিং করতে হবে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটা ইজি লকডাউন দরকার। মানুষকে পরীক্ষা করে শনাক্ত করে তাদের আইসোলেটেড করতে হবে। যারা পজিটিভ, তাদের আইসোলেটেড এবং যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের কোয়ারেন্টিন। পুরো এলাকা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করা, তালা-চাবি দেওয়ার কোনো দরকার নেই। কিন্তু লকডাউনের বিষয়ে সরকারের কোনো নজরই নেই।

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, অ্যান্টিবডি টেস্ট করতে পারলে বোঝা যেত সংক্রমণের হার কোন পর্যায়ে রয়েছে। অথচ সেটাও করা হচ্ছে না, তারা কী করছে, কী করতে যাচ্ছে কিছুই বুঝি না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ছিল- বুলেটিন চালু করার, সেটা করা হচ্ছে না, কারণ জনগণকে তারা ভয় পায়। অথচ বুলেটিনে মানুষ সঠিক সরকারি তথ্য পেত এবং সে অনুযায়ী কিছুটা সচেতন হচ্ছিলো। কিন্তু যখন তারা প্রেস রিলিজ দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের সেটা পাওয়ার স্কোপ কম।

অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, তারা যেহেতু এটা বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে পিপলস পারসেপশন অনেক কিছুই আসতে পারে, একে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা বিষয়ক পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজার কমিটির সদস্য এবং কোভিড-১৯ ল্যাবরেটরি টেস্ট এক্সপ্ল্যানশন পলিসি কমিটির কনভেইনার অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, রাজনীতি যদি বিজ্ঞানের ওপর বেশি ভর করে ফেলে, তাহলে সেখানে পলিসি খুব নেগলেটেড হয়ে যায়, আমাদের দেশে যেন সেটা না হয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের পর রাজনৈতিক বিবেচনা, এটাই সিস্টেম। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের পরার্মশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রাজনীতি আপারএন্ডে গেলে অনেক দুর্ভোগ থাকে, আর এটা শুধু বাংলাদেশ বলে নয়, পুরো পৃথিবীতেই কোভিড-১৯-এর রাজনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি জেনারেল ট্রেন্ড হয়ে গেছে, কিছু দেশ বাদ দিয়ে।

তিনি আরো বলেন, সরকার কমিউনিটি এনগেজমেন্টে ফেইল করেছে, একইসঙ্গে লকডাউন ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে, সেক্ষেত্রে কীভাবে কমিনিউটিকে সম্পৃক্ত করে কী কী মেজার নেওয়া যায়, সেগুলো করতে হবে। এখন আর অর্ডার দিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়, শুরুতে ট্রেন মিস করে ফেলেছি আমরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, মানুষ সচেতন হচ্ছে, মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মানুষ যদি নিজের সচেতনতা না বোঝে, নিজে বাঁচতে না চায়, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটুকু করতে পারে? তিনি বলেন, এটা হচ্ছে কল্যাণ রাষ্ট্র, কল্যাণ রাষ্ট্রে মানুষকে কতটা আইন ইমম্পোজ করতে পারি, সেটাও দেখতে হবে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন সংক্রমণের গতি নিম্নমুখী না হলেও এখন ‘ফ্ল্যাট কার্ভে’ এসেছে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি ছিল, এরপর সেটা ক্রমে একটু একটু করে কমে। কেউ কেউ বলেন এখন হার নিম্নমুখী, আমি এখনো নিম্নমুখী বলবো না। কিন্তু বলা যায় সেটা এখন একটি ‘ফ্ল্যাট কার্ভে’ রয়েছে। এই পরিস্থিতি ধরে রাখার জন্য কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বলেন, মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলার জন্য সরকারকে যেসব পরামর্শ আমরা দিয়েছিলাম, তার ৬০-৭০ শতাংশ সরকার শুনেছে। কিন্তু যেমন কোরবানির হাট ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে অনুমতি না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম আমরা, সেটা শোনেনি। তিনি বলেন, আমরা বুঝি যে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে অর্থনীতি দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু ঝুঁকি বেড়ে যায় এমন কিছু কাজ থেকে বিরত থাকাই দরকার। কিন্তু এখন যে অবস্থায় আছে পরিস্থিতি, তাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গেলে ঝুঁকিটা আস্তে আস্তে কমবে। তবে ঠিক কতদিন পর সংক্রমণ কমে আসবে এমন কোনো সময়সীমা তিনি বলেননি।

মন্তব্য লিখুন :