ইলিশের উৎপাদন বাড়বে

০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:১৭
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
ছবি-সংগৃহীত

চলতি বছর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৫১ দশমিক ২ ভাগ মা-ইলিশ সম্পূর্ণভাবে ডিম দিয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এটি অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। 

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, চলতি বছর প্রজনন মৌসুমে গত ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে মা-ইলিশ কর্তৃক ছাড়া মোট নিষিদ্ধ ডিমের পরিমাণ ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫ কেজি। এর শতকরা ৫০ ভাগ হ্যাচিং ধরে এবং তার শতকরা ১০ ভাগ বাঁচার হার ধরে এ বছর প্রায় ৩৮ হাজার কোটি জাটকা ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে। যা গতবারের চেয়ে ১ হাজার কোটি বেশি। আর গত বছর ইলিশের প্রজনন সফলতা ছিল ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। 

বিএফআরআই বলেছে, স্বাভাবিকভাবেই আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে বলে আশা করছি। বিএফআরআইর এই গবেষণায় দেখা যায়, প্রজনন মৌসুমের ২২ দিন সব প্রকার মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় প্রজননাঞ্চলে স্ত্রী ইলিশের শতকরা হার ৮৮ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে। ইলিশ প্রজননাঞ্চলে প্রথম সপ্তাহে স্পেন্ট ইলিশের হার গড়ে ৮ শতাংশ থাকলেও শেষ সপ্তাহসহ সামগ্রিক হিসাব মিলিয়ে এ বছর স্পেন্ট ইলিশের হার গড়ে প্রায় ৫১.২ শতাংশ পাওয়া যায়। তবে সম্পূর্ণ ডিম ছেড়ে দেওয়া এবং ডিম ছাড়ারত ইলিশের হিসাব শুধু প্রজননাঞ্চলে একত্রে বিবেচনা করলে সামগ্রিকভাবে এ বছর ইলিশ প্রজনন সফলতা ৮৩.৪ শতাংশ।

গবেষণায় তথ্য মতে, অন্যান্যবারের মতো এবারও ইলিশ সবচেয়ে বেশি ডিম ছেড়েছে পটুয়াখালী উপকূল এলাকায়। সেখানে ডিম ছাড়ার হার গড়ে ৭৫ শতাংশ। এরপরই রয়েছে ভোলার মনপুরায় ৬১ শতাংশ, কক্সবাজারে ৫০ শতাংশ ও চাঁদপুরে ৪১ শতাংশ। জরিপকালে ৩২ শতাংশ ইলিশ প্রজনন সক্ষম ছিল।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রজনন মৌসুমে ‘মা-ইলিশ’ রক্ষায় সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে ২২ দিন দেশের আট বিভাগে ২ হাজার ৬৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ১৯ হাজার ৮১৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে ২৪৩ কোটি ৩৬ লাখ ৪ হাজার টাকা মূল্যের ১২ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যের কারেন্ট জালসহ ২ হাজার ৬৮৫টি অন্য অবৈধ জাল জব্দ করা হয়।

মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ টন। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সেটা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন।

ওয়ার্ল্ডফিশের হিসাবে, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। অথচ চার বছর আগেও বিশ্বের মোট ইলিশের ৬৫ শতাংশ ধরা পড়ত বাংলাদেশে। দেশে যেখানে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে, সে তুলনায় প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে উৎপাদন কমেছে। ইলিশ উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে ভারত। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশের মোট উৎপাদিত মাছের ১২ শতাংশ ইলিশ। আর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে।

ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চলতি বছর সামগ্রিকভাবে দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও ইলিশ বেশি ধরা পড়েছে সাগরে। ফলে যারা সাগরে ট্রলার নিয়ে ইলিশ ধরতে গিয়েছেন, তারা বেশি ও বড় ইলিশ ধরতে পেরেছেন। আর নদীতে যেসব জেলে নিজস্ব উদ্যোগে ইলিশ ধরেছেন, তারা কম পেয়েছেন। আর এ বছর সাগরে ঘনঘন নিম্নচাপ থাকায় ছোট নৌযান সাগরে কম যেতে পেরেছে।

ওয়ার্ল্ড ফিশ, বাংলাদেশের ইকোফিশ প্রকল্পের দলনেতা অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব বলেন, ইলিশ ধরা জেলেদের জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এটি আরো বাড়ানো গেলে এবং দেশের ইলিশ আহরণকারী সব জেলেকে এর আওতায় নিয়মিত সহযোগিতার ব্যবস্থা করা দরকার। এটা নিশ্চিত করা গেলে কেউ আর নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ ধরতে যাবেন না। ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে।

বিএফআরআইর মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, চলতি মৌসুমে একটি নিম্নচাপ ছিল যা ইলিশের প্রজনন সফলতায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, এবার উৎপাদিত ৩৮ হাজার কোটি জাটকা যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারলে আগামী বছর ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে বলে আশা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় ইলিশের পাশাপাশি দেশে পাঙ্গাস, পোয়া, বোয়াল, আইড়, বাঘাইড় ও রিটা মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জরিপকালে যে পরিস্থিতি উঠে এসেছিল, তা একটু বদলেছে। সরকারি সহযোগিতা পাওয়ায় আগের চেয়ে কম জেলে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব জেলের আর্থসামাজিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। কারণ যে সহায়তা তারা সরকার থেকে পান, তা দিয়ে মৌলিক চাহিদাও অনেকাংশ পূরণ হয় না। তিনি বলেন, জেলেদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা দরকার। তাদের আরো বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম বলেন, ‘ইলিশ ধরায় জেলেদের আরো কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা আমরা বিবেচনা করে দেখছি। তবে শুধু জেলেদের মানা করলে চলবে না। ভোক্তারা নিষিদ্ধ সময়ে বাচ্চা ও ডিমওয়ালা ইলিশ যাতে না খান, সেটিও মনে রাখতে হবে।’

মন্তব্য লিখুন :