প্রচারের অভাব ও উপসর্গজনিত শর্ত কারণ

করোনার অ্যান্টিজেন টেস্টে শনাক্ত কম

১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৩৪
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
করোনার অ্যান্টিজেন টেস্ট হচ্ছে জয়পুরহাটে-ছবি সংগৃহীত

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্তে গত ৫ ডিসেম্বর দেশের ১০ জেলায় র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট চালু করে সরকার। কিন্তু অ্যান্টিজেন টেস্টে আশানুরূপ রোগী শনাক্ত হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচারের অভাব ও উপসর্গজনিত শর্তের কারণে মানুষ অ্যান্টিজেন টেস্ট করাতে পারছে না। 

মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর শনাক্তের একমাত্র উপায় ছিল আরটিপিসিআর (রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমারেজ রিঅ্যাকশন) টেস্ট। পরীক্ষা বাড়ানো, দ্রুত শনাক্তসহ, আরটিপিসিআর টেস্ট ও আলাদা ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতার কারণে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের প্রয়োজনীয়তার কথা শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটিও পিসিআর পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্ট কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দেয়।

এদিকে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু হওয়া ১০টি জেলা হচ্ছে পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মাদারীপুর ও সিলেট। এরমধ্যে সিলেট ছাড়া বাকি জেলাগুলোর সদর হাসপাতালে এই টেস্ট করা যাবে। সিলেটে অ্যান্টিজেন টেস্ট হবে শহীদ শামসুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

অ্যান্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। তাই এটি র‌্যাপিড টেস্ট নামেও পরিচিত।

গত ৫ ডিসেম্বর যশোরে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ১০ জেলাতে এই পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের উপস্থিতিতে।

যশোর জেলার সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন বলেন, শুরু হওয়ার পর থেকে গত ১২ দিনে এখানে অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়েছে মাত্র ৭৪ জনের। শনাক্ত হয়েছেন আট জন। একদিনে সর্বোচ্চ ১৪ জনের পরীক্ষা হয়েছে। ডা. শেখ আবু শাহীন বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্ট করার জন্য কিছু শর্ত আছে। যেমন-৫ থেকে ৭ দিনের জ্বর, সর্দি-কাশি-গলাব্যথার মতো লক্ষণের কথা বলা হচ্ছে। সর্দি-কাশি গলাব্যথা অনেকের থাকলেও ৫ থেকে ৭ দিনের জ্বর অনেকের নেই। যে কারণে চিকিৎসকরাও এ পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন না। তিনি আরো বলেন, উপজেলাগুলোতে প্রচার চালানো হয়েছে, সভা হয়েছে। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব করেছি। তবে বড় আকারে যে প্রচারণা দরকার তা হয়নি।

পটুয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত ১২ দিনে এ জেলায় মাত্র ৪৭ জনের অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়েছে। শনাক্ত হয়েছেন মাত্র একজন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. একরাম উল্লাহ বলেন, মানুষ টেস্ট করতে আসছে না কারণ অনেকেই ঘরে বসে ওষুধ খাচ্ছে। আবার র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের প্রচারণাও হয়নি। অনেকেই এ বিষয়ে জানে না। আবার এ টেস্টের জন্য যেসব উপসর্গ থাকতে হয় দেখা যাচ্ছে সেটাও অনেকের নেই। যেমন ৫ থেকে ৭ দিনের জ্বর থাকতে হবে।

গত ৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন সম্পর্কিত নীতিমালার খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। প্রায় তিন মাস আগে অ্যান্টিজেন নীতিমালা প্রণয়ন করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছিলেন, সরকার করোনার র‌্যাপিড টেস্টের জন্য অ্যান্টিজেন টেস্টকে অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মিডিয়া সেলের প্রধান ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আরটিপিসিআরে সবার টেস্ট করা হয়। যাদের উপসর্গ রয়েছে তাদের তো করা হয়, আবার যাদের লক্ষণ নেই কিন্তু রোগীর সংস্পর্শে ছিলেন বা বিদেশ থেকে এসেছেন, তাদের টেস্ট হয়। কিন্তু অ্যান্টিজেন টেস্ট কেবল উপসর্গ থাকলেই করা যাবে। যাদের লক্ষণ-উপসর্গ নেই তাদের এ পরীক্ষায় পজিটিভ আসবে না মন্তব্য করে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, এ জন্য গণহারে অ্যান্টিজেন টেস্ট হবে না।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) করোনা ল্যাবের ভাইরোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, ‘অ্যান্টিজেন এখনো ট্রায়ালের পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া প্রচারও নেই, এটা কোভিড টেস্টের মতো জটিল না। খুবই সহজভাবে যে টেস্টটা করা যাচ্ছে কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়া এ ধরণের প্রচারও বড় অভাব এই মুহূর্তে।’ তিনি বলেন, মানুষ অ্যান্টিজেন টেস্টটাকে অ্যান্টিবডি টেস্ট বলে ভুল করতেছে। অ্যান্টিজেন টেস্ট নিয়ে সম্পূর্ণভাবেই মানুষ ধোঁয়াশাতে আছে। যার কারণে টেস্টের ব্যাপারে আগ্রহ কম। এ ছাড়া করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভয়টা ছিল সেটা অনেকটাই কেটে গেছে, তাই মানুষ নমুনা পরীক্ষাতে আগ্রহ হারাচ্ছে। করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া যে সমস্ত কেলেংঙ্কারী হয়েছে তাতে নমুনা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও জনমানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমার্জেন্সী অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. এ বি মোহাম্মদ শামছুজ্জামান বলেন, অ্যান্টিজেন শুধুমাত্র কোভিড নির্ণয়ের জন্য। আমরা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি, গণমাধ্যমে প্রচারণার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচারের বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলব যাতে জনসাধারণ অ্যান্টিজেন নিয়ে কোনো প্রকার ধোঁয়াশার মধ্যে না থাকে।’

মন্তব্য লিখুন :