'ভ্যালেন্টাইন' এবং কিছু কথা

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৯
আরজু আহমাদ

প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে প্রথম কন্সট্যানটাইন খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। ৩০৬ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এরও বহু পরে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। সন্তানদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্ট ধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়৷

এর পূর্ব পর্যন্ত রোমানরা ছিল মূর্তিপূজক। তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার রোম জুড়ে ব্যাপকতর হলে তদানীং রোমান সম্রাট এটাকে একটা থ্রেট হিসেবে বিবেচনায় নেন এবং নাগরিকদের ধর্মত্যাগে চাপ প্রয়োগ করেন।         


সেসময় ভ্যালেন্টাইন নামে মোট চারজন সেইন্টকে পাওয়া যায়, যারা চার্চের সুরক্ষায় এবং খ্রিস্টধর্মের প্রচারের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। যথাঃ

১। রোমান চিকিৎসক ও পাদ্রি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি ছিলেন পদবীর দিক থেকে প্রেসবাইটার। বিশপের নীচেই। চিকিৎসক হিসেবে পুরো রোম জুড়েই তার খ্যাতি ছিল। বিশেষত অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব সারানোর চিকিৎসায় তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য। তাকে কারাবন্দী করা হয়।

কারাগারে তাকে ভয়াবহ রকম নির্যাতন করা হয়। যেন খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করেন সেজন্য তাকে রড দিয়ে পেটানো হত। তবুও ধর্মত্যাগ না করে উল্টে সম্রাটকেই খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানান। ২৭০ খ্রিস্টাব্দে তার শিরোচ্ছেদ করা হয়। এই ঘটনা রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাউডিয়াসের সময়কার।   

২। দ্বিতীয় যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন, তিনি ছিলেন ইন্টেরামনা (Interamna) নামক এক শহরের গীর্জার বিশপ। যার আধুনিক নাম টার্নি, রোম থেকে ৬০ মাইল দূরের এক শহর।

তিনি সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাউডিয়াসের সময়ে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের দায়ে গ্রেফতার হন। সম্রাটের কথায় ধর্মত্যাগ না করায় তাকেও ভয়াবহ নির্যাতন করা হয় এবং তিনিও অন্যায়ভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক হত্যার শিকার হন। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, এই ঘটনা সম্রাট অরিলাসের সময়কার। 

৩। তৃতীয় যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের কথা জানা যায়, তিনি তার আরও বেশ কিছু অনুসারীসহ রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্ত আফ্রিকায় একই প্রক্রিয়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন৷     

৪। চতুর্থ যে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের উল্লেখ পাওয়া যায় তিনি হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন ডুরোস্টোরাম শহরে। এই শহরটি ছিল প্রাচীন সিলিস্ত্রিয়ায়, বর্তমানে যা বুলগেরিয়া। রোমান গভর্নর এবসোলানাস এই শহরের শাসক ছিলেন। 

তাকেও পূর্ববর্তীদের মত একইভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা ছিল ১৪ এপ্রিলের। বুলগেরিয়ার কোথাও কোথাও এই দিনকে আজও চার্চগুলোয় ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে উদযাপনের চল আছে।

যাহোক, ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে এই প্রথম দুই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন হত্যার স্বীকার হয়েছেন ১৪ ই ফেব্রুয়ারি।

আর অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন অব রোম হত্যার স্বীকার হয়েছেন ৬ জুন। আর সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন অব টার্নি মারা গেছেন ৩০ জুন।

ফলত পৃথিবীব্যাপী ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে ১৪ ই ফেব্রুয়ারি পালন করে।

আর অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা পালন করে থাকে ৬ জুন। কোনও কোনও চার্চ ৩০ জুনও তা পালন করে থাকে। দুদিনের যে কোনও একদিন তারা সেইসব নিহতদের জন্য চার্চে সমবেত হয়।

রোমান শাসকরা এপোলোসহ আরও বহু দেবতার পূজা করত। সেসময় মূলত সব খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণকারীদের উপরই ব্যাপক দমন পীড়ন চালানো হয়৷ তৃতীয় শতাব্দীর সি ভয়াবহ পীড়নের কালে এইসব সেইন্টসরা নিজধর্মের সুরক্ষায় নিজেদের জীবন দিয়েছেন।

চারজন ভ্যালেন্টাইনের প্রত্যেকেই সঙ্গী, সাথী ও পরিবারসহ মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন। গ্রেফতারের পর ধর্ম পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হলেও তা তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

খ্রিস্টধর্মের জন্য এই ত্যাগ, এই ভালোবাসাকে স্মরণ করতেই মূলত অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক চার্চ আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের ঐতিহাসিক বর্ণনানুযায়ী ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করে থাকে। 

এই ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপনের মধ্যে দিয়ে যে শিক্ষার ধারণ করা হয় তা হলো- যা কিছুই বরণ করতে হোক, যত প্রতিকূলতাই আসুক, যদি রোমান সম্রাটের মত পরাক্রমশালী শক্তির বিরুদ্ধেও লড়তে হয়, এমনকি এতে যদি মৃত্যুকেও বেছে নিতে হয় তবুও খ্রিস্টধর্মের সুরক্ষায় তা করতে হবে।

অর্থাৎ ভ্যালেন্টাইন ডের মূল স্প্রিরিটটা হচ্ছে, পরিবার, প্রিয়জন, নিজের প্রতি ভালোবাসার চে' খ্রিস্টধর্মের প্রতি ভালোবাসাটাই হবে মৌলিক। প্রয়োজনের মুহূর্তে বাকিসব তা ছাপিয়ে যাবে।

আমি সেইসব সেইন্টদের এই ত্যাগ এবং এই স্প্রিরিটকে শ্রদ্ধা জানাই। খ্রিস্টানদের এই ভ্যালেন্টাইনকে অবশ্যই উৎসাহের সঙ্গে উদযাপনের অধিকার আছে।

কিন্তু যারা ভ্যালেন্টাইন ডে-এর মত এত গুরুতর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিকৃতি করেছেন 'ভালোবাসা দিবস' নাম দিয়ে তারা এটা কেন করেছেন? 'ভ্যালেন্টাইন' তো একটা নাম, নামের তো অনুবাদ হয় না। 

ভ্যালেন্টাইনের অনুবাদ 'ভালোবাসা' হয় কী করে? ভ্যালেন্টাইন শব্দের উদ্ভব হচ্ছে, ল্যাটিন শব্দ 'ভ্যালেন' থেকে, যার অর্থ 'সুঠাম'। তাহলে এই অনুবাদের মধ্য দিয়ে কি আমাদের মুসলিম তরুণদের আপাত বিভ্রান্ত করে খ্রিস্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপনে প্রাণিত করাই কি উদ্দেশ্য?

মন্তব্য লিখুন :