আল আযহারীর সাতকাহন

১৪ জুন ২০২০, ২১:৫০
আরিফ মুহাম্মদ
আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর

১.

কিছু দিন আগে মিশরস্থ বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের সতর্কীকরণ পোস্ট দেখলাম। এই পোস্টে আল-আযহারী উপাধি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক ভাবে যারা আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেননি তাঁরা যেন এই বিশেষণ ব্যবহার করে বিভ্রান্ত সৃষ্টি না করেন এই মর্মে সতর্কীকরণ পোষ্ট ছিল । মিশরে আল-আযহার সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রদের জন্য অর্গানাইজেশটি ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্রদের সম্ভাব্য সব ধরণের সহযোগিতা করে থাকে। অরাজনৈতিক এই ছাত্র সংগঠনটি ২০০৫ সাল থেকে সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সফলতার সাথে এগিয়ে চলছে। এ ধরণের সতর্কীকরণ পোস্ট সংগঠনের দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে। সাথে সাথে একটি শব্দ নিয়ে আমাদের দেশে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

২.

দীর্ঘ সতেরটি বসন্ত মিশরে চলে গেছে। এই সময়ে ছয়টি বছর কেটেছে ফরেইন স্টুডেন্ট হোস্টেলে। এই হোস্টেলে প্রায় ১১০ টি দেশের শিক্ষার্থীরা এক সাথে থেকে আলা-আযহারে অধ্যয়ন করে থাকেন। এই দীর্ঘ সময়ে আল-আযহারী শব্দটি ব্যবহার করতে কাওকে শুনিনি। শব্দটির সাথে আমি পরিচিত হয়েছি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মাধ্যেমে। আল-আযহারে অধ্যয়ন করে দেশে ফিরে নিজেদের নামের পর আল-আযহারী যোগ করে থাকেন। বলতে গেলে আল-আযহারের ভূমীতে আমি এই ধরণের সম্বন্ধীয় শব্দের সাথে পরিচিত নই।  হাতে গুনা দু একজন মিশরী ব্যক্তিত্বও আল আযহয়ারী লিখে থাকেন। কিন্তু তারাও আগে এই  শব্দটিকে ব্যাপক ব্যবহার করতেন না। আরব বসন্তের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁদের উপাধিটি হাইলাইট হয়েছে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই আলোচনার মূল বিষয় নয়। মোট কথা আমি মিশরে আল-আযহরী শব্দটির সাথে গত সতের বছরে পরিচিত হতে পারিনি। বলতে গেলে শব্দটি আল-আযহারের দেশ থেকেও আমাদের দেশে  বেশী ব্যবহৃত।

৩.

আল-আযহার যাত্রার১০৮০ বছর পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ এই যাত্রায়    ইসলামী রেনেসাঁর কত অগ্রপথিক এখানে শিক্ষার্থী ছিলেন বা শিক্ষক তার সংক্ষিপ্ত বিবরণও এই লেখায় দেয়া সম্ভব নয়। ইবনে মালিক থেকে নিয়ে শাত্বেবী আল-জাযারী,  হাফেজ আবঃ রহীম ইরাক্বী, তার সুযোগ্য ছেলে ওয়ালিউদ্দীন আবু যুরয়া আল ইরাক্বী, ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন, শাইখুল ইসলাম হাফেজ বুলক্বীনী, ইমাম নুরুদ্দীন আল হাইসামী, হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী, কামাল ইবনুল হুমাম, হাফেজ সাখাভী, হাফেজ জালালুদ্দীন সুয়ুতী, হাফেজ জাকারিয়া আল আনসারী, ইবনে হাজার হাইসামী রঃ সহ আসলাফদের এক বিরাট জামাত এই উম্মতকে আল-আযহার  উপহার দিয়েছে। ফিক্বহ, উসূলে ফিক্বহ, হাদীস উলূমিল হাদীস সহ দীনী ইলম চর্চায় তাঁদের ছেড়ে আমরা কোন ভাবেই আগাতে পারব না। তাঁদের নামের পরে আল-আযহারী নেই। বেশ কিছু আসলাফের নামের শেষে তা পাওয়া যায়। আমার জানা মতে বংশীয় বা অন্য কোন কারণে তা ব্যবহৃত হয়েছে। আল- আযহারের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে নয়।  

৪.

আল- আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরে পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ছাত্র পড়ে থাকে। গ্রাজুয়েশনেই  প্রায় ৫ লক্ষাধিক ছাত্র শিক্ষাগ্রহণ করে থাকে। প্রতি বছর ৪৫/৫০ হাজার শিক্ষার্থী এখানে স্নাতক লাভ করে শিক্ষা সম্পন্ন করে থাকে।  প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ছাত্র সংখ্যা বা নাই বলা হল। বিশ্বে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা পড়েছেন তাঁদের  পরিসংখ্যান হলে হয়ত দেখা যাবে দুই তৃতীয়াংশ আযহারের দখলে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে ইসলামী শিক্ষা বা গবেষণায় আযহারী স্কলারদের ভূমিকা দেদীপ্যমান। এরা  আল-আযহারী বিশেষণ ব্যবহার করেন বলে আমার জানা নেই। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেই এই বিষয়টি ব্যতিক্রম। যারাই আযহার পড়েন সাধারণত তাঁরা আযহারী লিখে থাকেন। সাম্প্রতিক দেখা যাচ্ছে না পড়েও কেও কেও লেখা শুরু করেছেন। এই জন্যই মূলত সতর্কতার পোষ্টটি এসেছে। আযহারে অধ্যয়নকারীরাই শুধু নয়, আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণকারী অন্যান্যরাও তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্বন্ধ করে শব্দ ব্যবহার করেন। দেওবন্দে পড়ে লিখেন ক্বাসেমী। মদীনা বিশ্ব বিদ্যালয়ে  পড়ে লিখেন মাদানী। নামের শেষে রকমারি বিশেষণের প্রবণতা আমাদের দেশেই অতি মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। অন্য দেশে এই প্রবণতা খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। 

৫.

প্রতিষ্ঠানে পড়া গর্বের হোক বা ঐতিহ্যের, সেটা নামের সঙ্গে জড়িয়ে প্রকাশ করার খুব জোরালো যৌক্তিকতা তেমন নেই। স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে এ ধরণের শব্দ ব্যবহারে এক ধরণের ফেরক্বাবাজির সূত্র তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে তা প্রকাশও পায়। ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তির কারণও হচ্ছে। অন্যদিকে একটু লক্ষ করুন যত গর্বের বিষয়ই হোক না কেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, এমন কেও কিন্তু ঢাকুবী লিখে না। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড বা ক্যমব্রিজে গ্রাজুয়েশন করে কেও তার প্রতিষ্ঠানের সংগে সংযুক্তিসূচক শব্দ ব্যবহার করেনা। তাঁদের কি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন নিয়ে গর্ব কম! নিশ্চয়ই তা নয়! 

আমার ধারণা, আধুনিক শিক্ষিতরা একটা বাস্তবতা মনের ভেতর গেঁথে নেয়। সে যত বিশেষণ-ই নিজের নামের আগে পরে লাগিয়ে দিক না কেন কাজে নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে না পারলে সেটার কোন মূল্য নেই। বাস্তবতার অপ্রতিরোধ্য ঢেউয়ের সামনে টিকা যাবে না। কাজেই কাজ ও কীর্তি ই পরিচিত হওয়ার মূল মানদণ্ড। শব্দ বা বিশেষণ নয়। তাই তাঁরা কাজে বিশ্বাসী। আমরা ঠিক উলটো। কাজের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেই না। লকব আর প্রশংসার ক্ষেত্রে সদা সচেতন থাকতে অভ্যস্ত। আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন খুব জরুরী।

৬.

আসলাফরা ইলম অর্জন করেছেন দীন ও উম্মতের খিদমাত করার জন্য। এই লক্ষ্যে পৌছতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। জীবন উৎসর্গ করেছেন। কাজেই শব্দ বা উপাধি নিয়ে ভাবার মত মানসিকতাই তাঁদের ছিল না। বরং নিজেকে গড়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মেহনত করেছেন। অধ্যবসা করেছেন। ফলে ইতিহাস তাঁদের খোজে নিয়েছে। কাজ ও ব্যক্তিত্বের গুণে তাঁরা হয়েছেন অমর। শব্দ বা উপাধি দিয়ে কখন-ই তাঁরা পরিচিত হতে চাননি। 

অন্য দিকে দুর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারীদের মাঝে বিশেষণের প্রতি বেশ আসক্তি লক্ষ্য করা যায়। এই ধরণের প্রবণতাকে রোধ করে আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে মনোযোগ দেয়া খুব জরুরী। দীন ও উম্মতের জন্য নিজেকে গঠন করতে পারলে ইতিহাস আমাদেরকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। অন্যথায় অনেক লক্বব নিয়েও বদনামের শেষ হবে না। 

কোন বিশেষণ ব্যবহার অপরাধ নয়। যারা ব্যবহার করছেন তাঁরা কোন গর্হিত কাজ করছেন তাও মনে করি না। যৌক্তিক প্রয়োজনে তা হতেই পারে। বিশেষ করে দীন ও ইসলামের কোন খিদমাতে যদি এই ধরণের শব্দ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে তবে তা দীনের জন্যই করতে হবে। সামাজিক পরিচিতি বা ব্যক্তি ইমেজ তৈরির জন্য যেন না হয় এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যারা উলামা হিসেবে সমাজে পরিচিত তাঁদের  দায়িত্ব অনেক। সবকিছুতেই   ইলমী ও দীনী রুচি-বোধ থাকা জরুরী। আসলাফের হায়াত থেকে আমরা এমন শিক্ষাই পেয়ে থাকি। 

৭.

আমরা জাতিগত ভাবেই অসংযম ও অতি আবেগী। উপরন্তু আমরা আলেম সমাজ রকমারি কারণে বিভক্ত হয়ে আছি। এমন বিভক্তি  সমাজের অন্য কোন শ্রেণীতে পাওয়া দুষ্কর। সবাই ঐক্যের কথা বলি। ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জানি। কিন্তু ঐক্য আর হচ্ছে না। বিচ্ছিন্নতা-ই বেড়ে চলেছে। মতানৈক্যের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রচ্ছন্ন ভাবে শ্রেণী বিভক্তির গন্ধের সম্ভাবনাময় শব্দটুকুও আমাদের ত্যাগ করা উচিত। সেটা আপাত দৃষ্টিতে যত সুন্দর ই হোক না কেন।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক  বিশেষণ ব্যবহার উচিত নয়। পর্যায়ক্রমে এটা মহামারীর রূপ নিতে যাচ্ছে। "সাদ্দুয যারায়ে" ফিক্বহর একটি উল্লেখযোগ্য নিয়ম। এই নিয়ম অনুযায়ীও মনে হচ্ছে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আসুন আমরা আযাহারী, মাদানী, ক্বাসেমী, নদভী ইত্যাদি গন্ডিরেখা থেকে বের হয়ে আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরিচিত হতে অভ্যস্ত হই। অপ্রয়োজনীয় শব্দের হানাহানির ঊর্ধ্বে উঠার চেষ্টা করি। ইসলাম ও উম্মতের জন্যই নিজেদের জীবন গড়ে তুলি। আমাদের আদর্শ যেন সাইয়্যুদুনা রাসূলুল্লাহ সাঃ আর  ইবরাহীম আঃ মত হয়ঃ

 قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (161) قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (162) لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.

মন্তব্য লিখুন :