যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট আজ

০৩ নভেম্বর ২০২০, ০১:৫২
অনুসন্ধান ডেস্ক
আজ ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে-ছবি সংগৃহীত

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মাঝেই আজ ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কে হবেন ক্ষমতাধর দেশটির ৫৯তম প্রেসিডেন্ট, এনিয়ে সারা বিশ্বেই চলছে তুমুল জল্পনা।

আবার কি ডোনাল্ড ট্রাম্পই ধরছেন আমেরিকার হাল, নাকি আসছেন জো বাইডেন? আবার রিপাবলিকান, নাকি এবার ডেমোক্র্যাট? এসব প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে ভোট আজ।   

করোনা আবহের মধ্যেও বিশ্ববাসীর নজর আমেরিকায়। ভোটের অন্যতম ইস্যু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। ভোটের জনসভা, বিতর্কসভা এবং অন্যান্য জমায়েতের কারণে করোনার সংক্রমণ আরো বাড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন বিস্তর। তবু আমেরিকায় চার বছর অন্তর নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পর মঙ্গলবারের ভোটের রীতিতে বদল হয়নি এবারও। 

কে এগিয়ে কে পিছিয়ে, সংখ্যাতত্ত্ব-পরিসংখ্যান নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিবিসির সমীক্ষা বলছে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ৫২ শতাংশের মতো পপুলার ভোট বা সরাসরি জনগণের ভোটে এগিয়ে রিপাবলিকান ট্রাম্পের চেয়ে। অন্যান্য প্রায় সব সমীক্ষাতেও ইঙ্গিত তেমনই। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। আসল যুদ্ধ ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটে। তাতে যিনি ২৭০-এর ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারবেন, শেষ মুহূর্তে বাজিমাত হবে তারই।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি কথা খুব প্রচলিত- কত ব্যবধানে জিতছেন, সেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোথায় জিতছেন। ইলেক্টোরাল কলেজের ভোট বেশি এমন রাজ্যগুলি হয়ে ওঠে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ট স্টেট’। তাই পপুলার ভোট বেশি পাওয়ার অর্থই যে সেই প্রার্থী জিতে যাবেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে এমন নজির বহু রয়েছে। শেষ উদাহরণ হিলারি ক্লিন্টন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারির চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ কম ভোট পেয়েও শেষ পর্যন্ত ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটে বাজি জিতে নেন ট্রাম্প।

এর কারণ লুকিয়ে রয়েছে আমেরিকার জটিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যে। কেমন সেই পদ্ধতি? সাধারণ মানুষের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট। প্রথমে জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোট দেন ভোটাররা। সেই প্রক্রিয়া প্রায় এক বছর ধরে চলে। ব্যালট পেপারের ক্ষেত্রেও এক একটি রাজ্যের জন্য নিয়ম আলাদা। কিছু রাজ্য আছে, যেখানে শুধু প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের নামই থাকে। আবার রাজ্যের প্রতিনিধিদের নামও ব্যালটে থাকে অনেক রাজ্যে। জনগণের এই সরাসরি ভোটকে বলা হয় পপুলার ভোট।  

পপুলার ভোটের পাশাপাশি রয়েছে ইলেক্টোরাল কলেজের ভোট। শেষ কথা কিন্তু এই ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটই। আমেরিকার ৫০টি রাজ্যে এই ইলেক্টোরাল কলেজ বা বোঝার সুবিধার্থে বলা যেতে পারে ‘আসন সংখ্যা’ ৫৩৮। সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা অর্ধেকের বেশি আসন নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দরকার ২৭০ আসন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। সেই দিক থেকে সবচেয়ে বড় রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া, ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা ৫৫। অন্যতম বড় রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে টেক্সাস (৩৮), ফ্লোরিডা (২৯), ক্যালিফোর্নিয়া (২৯)। এই বড় রাজ্যগুলিতে এগিয়ে থাকলে জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। আবার আলাস্কা ও নর্থ ডাকোটা রাজ্যের হাতে রয়েছে তিনটি করে ইলেক্টোরাল ভোট।

ভোটের নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাজ্যে যে দল বেশি পপুলার ভোট পায়, সেই রাজ্যের পুরো ইলেক্টোরাল কলেজের সব ভোট যায় সেই দলের দখলে। আমেরিকার সময় অনুযায়ী ৩ নভেম্বর এই পপুলার ভোটের হিসেব কষা হবে। পরে ইলেক্টোরাল কলেজের জয়ীরা নির্বাচিত করবেন প্রেসিডেন্ট ও ভাইসপ্রেসিডেন্টকে। আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট। তবে দু’বারের বেশি কেউ প্রার্থী হতে পারেন না ভোটে। সেই হিসেবে বারাক ওবামা, জর্জ বুশ কিংবা বিল ক্লিন্টন- কেউই আর আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। মূলত আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই আইন করা হয়েছে। ওয়াশিংটন দু’বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তৃতীয়বার নিজে থেকেই আর প্রার্থী হননি। সেই দিক থেকে দেখলে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বার নির্বাচিত হলে, তিনিও চলে যাবেন বুশ, ওবামাদের দলে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সব সময় নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার হয়। এখনো পর্যন্ত সে দেশের ইতিহাসে এর কোনো নড়চড় হয়নি। তাই তারিখ নির্দিষ্ট থাকে না। নভেম্বরের ১ তারিখেই মঙ্গলবার হোক আর যে তারিখেই হোক, প্রথম মঙ্গলবারই ভোট হয়। এ বছর নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার পড়েছে ৩ তারিখে। ফলে ওই দিনই অগ্নিপরীক্ষা। যদিও বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ১০ ঘণ্টা পিছিয়ে আমেরিকা। তাই বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হবে ভোটাভুটির পর্ব। 

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্যে জনগণের ভোট, যা পপুলার ভোট হিসেবে পরিচিত, বেশি পাওয়ার দরকার হয় না। এর পরিবর্তে প্রার্থীরা বরং ইলেকটোরাল কলেজে বেশি ভোট পাওয়ার দিকেই তাকিয়ে থাকেন।

গত নির্বাচনে সাধারণ জনগণের ভোট কম পেয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আগের যে কোনো সময়ের নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রচুর সংখ্যক মানুষ ডাকযোগে ভোট দিচ্ছেন। এসব পোস্টাল ভোট গণনার জন্য আরো বেশি সময় লাগতে পারে, এবং কোনো কোনো রাজ্য ভোটের আগের দিন পর্যন্ত এই গণনা শুরু হবে না, ফলে কিছু কিছু রাজ্য থেকে ফলাফল পেতে নিশ্চিতভাবেই বিলম্ব ঘটবে।

এবার যেহেতু এতো বেশি সংখ্যক মানুষ ডাকযোগে ভোট দিচ্ছে, প্রাথমিক ফলাফলে একজন প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও পরে সেটা বদলে যেতে পারে। একারণে এসব সংখ্যার ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকতে হবে।

নির্বাচনের কিছু শব্দ বা টার্ম : বেলওয়েদার স্টেট : ওহাইও এবং মিজৌরির মতো কিছু রাজ্যকে বেলওয়েদার স্টেট বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেখা গেছে এসব রাজ্যে ভোটাররা যে প্রার্থীকে বেশি ভোট দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই জাতীয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এক্সিট পোল বা বুথফেরত সমীক্ষা : ভোটাররা যখন ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসেন তখন তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়। অল্প কিছু সংখ্যক ভোটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ফলে এই এক্সিট পোলের ফলাফলও চূড়ান্ত ফলাফল থেকে ভিন্ন হতে পারে।

ইলেক্টোরাল কলেজ : প্রত্যেকটি রাজ্যের ভোটের সংখ্যা ভিন্ন। এই ভোটকে বলা হয় নির্বাচক বা ইলেকটর। রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে ওই ইলেকটরের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেটা হয়, যে প্রার্থী একটি রাজ্যে জয়ী হন, তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। এই ইলেকটররা পরে একত্রিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। ইলেকটোরাল কলেজে (নির্বাচকম-লী) মোট ভোটের সংখ্যা ৫৩৮ এবং নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হতে হলে একজন প্রার্থীকে ২৭০টি ভোট পেতে হবে।

প্রজেকশন (ধারণা) বনাম কলিং (চূড়ান্ত) : নির্বাচনের রাতে ব্যালট গণনা থেকে ধারণা বা প্রজেক্ট করা হয় প্রত্যেক রাজ্যে ও জাতীয়ভাবে কোন প্রার্থী বিজয়ী হতে চলেছেন। যথেষ্ট তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো একটি রাজ্যে কে বিজয়ী হয়েছেন সেটা ঘোষণা করা হয় না। এসব তথ্যে মধ্যে রয়েছে আগাম ভোট, এক্সিট পোল এবং নির্বাচনের দিন যেসব ভোট গণনা করা হয় সেগুলো।

সুইং স্টেট বা ব্যাটেলগ্রাউন্ড রাজ্য : যেসব রাজ্যে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন তা স্পষ্ট নয় সেগুলোকে বলা হয় সুইং স্টেট বা ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট। এর অর্থ হচ্ছে তারা ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যে কোন প্রার্থীকেই বেছে নিতে পারেন।

লাল রাজ্য বনাম নীল রাজ্য : এসব রাজ্যে পরিষ্কার যে তারা বিশেষ কোনো একটি দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিচ্ছে। রিপাবলিকান দলের সমর্থন বেশি যেসব রাজ্যে সেগুলো লাল এবং ডেমোক্র্যাট দলের প্রাধান্য যেখানে সেসব নীল।

কীভাবে জানা যাবে কে জয়ী হচ্ছেন : যেহেতু এবার ডাকযোগে প্রচুর ভোট পড়েছে তাই প্রাথমিক ফলাফলে কে এগিয়ে আছে সেটা বোঝা কঠিন হবে। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৬ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার দ্বিগুণ পোস্টাল ভোট পড়েছে।

এসব পোস্টাল ভোট কখন ও কীভাবে গণনা করা হবে তার জন্য একেক রাজ্যে রয়েছে একেক ধরনের আইন। সেকারণে এসব রাজ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে ফলাফল পাওয়া যাবে এবং কখনো কখনো সময়ের এই ব্যবধান খুব বেশিও হতে পারে। কিছু কিছু রাজ্যে, যেমন ফ্লোরিডা এবং অ্যারিজোনা, সেখানে পোস্টাল ভোটের গণনা শুরু হয়ে যাবে ৩ নভেম্বরের ভোটের দিনের আগে। কিন্তু উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় ৩ নভেম্বরের আগে সেগুলো স্পর্শ করা হবে না। ফলে সেখান থেকে ভোটের ফলাফল দেরিতে আসবে।

এখানে আরো কিছু জটিলতা আছে। পোস্টাল ভোট দেওয়ার সময়সীমা একেক রাজ্যে একেক রকমের। কিছু রাজ্য, যেমন জর্জিয়া, সেখানে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত যেসব ভোট কর্তৃপক্ষের হাতে এসে পৌঁছাবে সেগুলো গণনা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্য, যেমন ওহাইও, সেখানে ৩ তারিখে ভোট দিলেও (অর্থাৎ খামের মধ্যে ৩ নভেম্বর সিল থাকতে হবে) সেসব ভোট গণনা করা হবে।

এটা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, কিছু কিছু রাজ্যের সম্পূর্ণ ফলাফল পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। ফলে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম কখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে সেটা আগে থেকে ধারণা করা কঠিন।

পরিষ্কার করে কেউ বিজয়ী না হলে কী হবে? : ৩ নভেম্বরে যদি পরিষ্কার না হয় যে কে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, তাহলে ভোট গণনা শেষ হওয়ার জন্য আরো কয়েক দিন এমনকি কয়েক সপ্তাহও অপেক্ষা করতে হবে।

ভোটের রাতেই সব ভোট গণনা শেষ করা যায় না- যুক্তরাষ্ট্রে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এবার এই গণনা শেষ হতে আরো অনেক বেশি সময় লাগতে পারে। এর সাথে যুক্ত হতে পারে আইনগত বিরোধ। সেরকম কিছু হলে অনিশ্চয়তা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাতে আদালতেরও ভূমিকা থাকতে পারে।

মন্তব্য লিখুন :