এক পুলিশ কর্মকর্তার কয়েকটি সাহসী অভিযানের গল্প

২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১০:২৭
হাসান আলী
এসআই নিয়াজ

সামনে বিপদ দেখলে যখন সবাই পিছিয়ে যায়, ঠিক সেই সময়ই সেটা মোকাবিলায় এগিয়ে যান কিছু মানুষ। এই সাহসী মানুষেরাই নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঁচিয়ে দেন অনেকের প্রাণ। বিপদের মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রাণ দিতেও পিছপা হন না তারা। তেমনই একজন মানুষ টঙ্গীর তুরাগ থানায় কর্মরত এসআই নিয়াজ শরীফ। ৩৫তম আউট সাইড ক্যাডেট ব্যাচের এই পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকায়। তার বাবার নাম মোশারফ হোসেন।

গত বছরের ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ আসন উপনির্বাচনে কামারপারা কেন্দ্রে কিছু দুর্বৃত্ত ককটেল বিস্ফোরণ শুরু করলে প্রাণভয় ছোটাছুটি শুরু করেন সাধারণ মানুষ। সেসময় আশপাশে অনেকেই থাকলেও দুর্বৃত্তদের ঠেকাতে এগিয়ে আসার সাহস করেননি কেউ। এ সময় নিজের জীবন বিপন্ন করে দৌড়ে গিয়ে ৫টি ককটেলসহ এক দুর্বৃত্তকে ধরে ফেলেন নিয়াজ। 

স্থানীয়রা জানায়, যখন নিজের জীবন বাঁচাতে সবাই ছোটাছুটি করছিলেন, তখনই এগিয়ে আসেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। দৌড়ে গিয়ে এক দুর্বৃত্তকে জাপটে ধরেন তিনি। অথচ ওই দুর্বৃত্তের কাছে তাজা ককটেল ছিল। ককটেলের ভয়েও নিজের দায়িত্ব থেকে পিছপা হননি ওই পুলিশ কর্মকর্তা। এমন সাহসী পুলিশই চায় সাধারণ মানুষ।  

এর কয়েকদিন পরই আরেকটি দুঃসাহসী অভিযানে নেতৃত্ব দেন এসআই নিয়াজ। গত ৩০ ডিসেম্বর তুরাগ থানা এলাকায় দীর্ঘদিনের চোলাই মদের কারখানা ধ্বংস করেন তিনি। একই সময়ে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন এক ড্রাম মদ। এইসঙ্গে দুর্ধর্ষ এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেন নিয়াজ। এর আগে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। শুধু ওই মাদক ব্যবসায়ীই নয়, তুরাগ থানা এলাকার আরো কয়েকজন দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছেন নিয়াজ। এতে ওই এলাকার মাদক ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।   

নিয়াজের হাতে গ্রেপ্তার এক গাঁজা সম্রাট 

তুরাগ এলকায় বসবাসকারী নয়ন নামে এক যুবক জানান, আগে তুরাগের যত্রতত্র মাদক কেনা-বেচা হতো। এতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে খুবই দুঃচিন্তায় থাকতেন। তবে পুলিশের সাহসী ভূমিকায় বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, অনেকে পুলিশের ভয়ে পলাতক। কেউ কেউ মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

এছাড়াও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জন্য তুরাগ থানা এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এসআই নিয়াজ। এলাকায় যেকোন কাজে সবার আগে নিয়াজকে ডাকেন স্থানীয়রা। তিনিও যে কোনো সমস্যায় সবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এলাকায় বাল্যবিবাহ রোধ এবং মদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির কারণে সাধারণ মানুষের প্রিয় হয়ে উঠেছেন নিয়াজ।

তবে এরই মধ্যে মূদ্রার উল্টো পিঠও দেখেছেন নিয়াজ। অপরাধ দমনে ভূমিকা রেখে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি অপরাধীদের বিরাগভাজনও হতে হয়েছে তাকে।

স্থানীয় মদক ব্যবসায়ীরা পারস্পারিক যোগসাজসে এস আই নিয়াজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এসআই নিয়াজ সঙ্গীয় ফোর্সসহ একটি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে তুরাগের ১৭নং সেক্টরের ২নং ব্রিজের পাশ থেকে জৈনক ইয়ার আলী খান নামে একজন মাদক ব্যবসায়ীকে ৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করেন। এসময় ওই মাদক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি স্বীকার করেন তার বাসায় আরও ইয়াবা ট্যাবলেট রয়েছে । বিষয়টি তৎক্ষণাৎ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করেন এসআই নিয়াজ। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মাদক ব্যাবসায়ী ইয়ার আলী খানের বৃন্দাবন এলাকার একটি বস্তির বাসায় তল্লাশি করে আরও ৪৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেন।

দেখুন পুলিশের অভিযানের সেই ভিডিও

দেখুন মাদক ব্যবসায়ীদের বানানো সেই মিথ্যা ভিডিও 

এই ব্যাপারে এস আই নিয়াজ মোঃ শরিফ বাদী হয়ে মাদক আইনে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং- ২৬,তাং- ১৭/১/২০২১ইং। আর এই ঘটনাটিকে কেদ্র করে মাদক ব্যবসায়ী ইয়ার আলী খানের ছেলে শরিফুল ইসলাম রনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে এস আই নিয়াজ সহ উক্ত মাদক বিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বাসায় তল্লাশিকালে আলমারির তালা ভেঙে ১৩ লাখ টাকা নেওয়া ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মারধরের অভিযোগ এনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। 

তবে মাদক ব্যবসায়ীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মারধরের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এসআই নিয়াজসহ অভিযানে অংশ নেওয়া অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা। 

নিয়াজ বলেন, ইয়াবাসহআটক হওয়ার পর পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে সম্পূর্ণ ইচ্ছাপ্রণোদিত ভাবে এই মিথ্যা অভিযোগ করেছেন ওই মাদক ব্যবসায়ীর পরিবারের সদস্যরা। অভিযান চালানোর সময় পুরো ঘটনা ভিডিও করেছে পুলিশ। আর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও প্রাথমিক তদন্তে তাদের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি।

তুরাগ থানার ওসি মেহেদি হাসানও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওই মাদক ব্যবসায়ীর অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। অভিযান চালানোর সময়ের পুরো ঘটনার ভিডিও পুলিশের কাছে আছে।

অন্যদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাদক ব্যবসায়ী ইয়ার আলী খানের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলাও রয়েছে।

মন্তব্য লিখুন :