রাজনীতির মহাকবির বয়ান

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৯
রায়হান উল্লাহ

‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ আমেরিকা প্রবাসি বাঙালি তপন দেবনাথের প্রবন্ধগ্রন্থ। একে সহজেই গবেষণা কিংবা ইতিহাসগ্রন্থও বলা চলে। জাতির পিতা শেখ মুজিবকে জানতে সহায়তা করবে এই গ্রন্থ। তিনি কীভাবে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন একটি ভূখণ্ডের সৃষ্টি করেছেন তার সংগ্রামমুখর দিনলিপি জানা যাবে এই গ্রন্থ পাঠে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত আরো নানা ঘটনা জানা যাবে। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দেশের উন্নয়নে আবদানের কথা মিলবে এই বইয়ে।

তপন দেবনাথ অত্যন্ত সুচারুরূপে প্রতিটি ইতিহাস তুলে ধরেছেন যেন তিনি এসবের স্বাক্ষী। তিনি একজন ঐতিহাসিক হিসেবে স্বাক্ষী হয়েছেনও। এ থেকেই তার লেখা সামগ্রিক হয়েছে।

সামগ্রিক হবে না কেন? তিনি নিজে একজন ভালো মানের লেখক, কবি ও সাংবাদিক। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছেন। বর্তমানে দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের লস এঞ্জেলস সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করছেন।

‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইটি তার ২৭তম গ্রন্থ। এটিতে আটটি অধ্যায় সূচিত হয়েছে। অধ্যায়গুলো হলো- ১. ছয় দফাই এক দফা : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ২. ৭ মার্চের ভাষণ : জয় বাংলাই শেষ কথা, জয় পাকিস্তান নয়, ৩. ২৫ মার্চের কালরাত : যে কারণে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যাননি, ৪. জেনারেল জ্যাকব : বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক সফল কারিগর, ৫. জগজিৎ সিংহ অরোরা ও বাংলাদেশ, ৬. পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল ও জেনারেল জ্যাকবের অবদান, ৭. মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় ঘনশ্যাম চেজারার বিরল সৌভাগ্যের কথা ও ৮. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : বাংলাদেশের উন্নয়নই যার একমাত্র স্বপ্ন।

একজন সুলেখক তপন দেবনাথের ‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইটি মুক্তিযুদ্ধকে জানতে সহায়ক হবে। আধুনিক প্রজন্ম যারা মুক্তিযুদ্ধকে দেখেনি কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে জানতে নানা বইয়ের আশ্রয় নিচ্ছে তাদেরও সহায়ক হবে এই বই। একজন লেখক যিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ তাঁর মাঝে সংক্রমিত হয়েছে; তার বয়ান আছে এই বইয়ে। এবং তাই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ।

একজন মুজিবপ্রেমিক তপন দেবনাথ ‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘নয় মাস মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের কথা বাদ দিলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আসলে ১৯৪৭ সাল থেকেই সূচিত হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ বাঙালিকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখাতে বাধ্য করে। দীর্ঘ তেইশ বছর সে শাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত বাঙালি ’৭০-এর নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়। তার মূল ভূমিকা পালন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

লেখক ‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইয়ের ‘২৫ মার্চ কালরাত : যে কারণে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যাননি’ পরিচ্ছেদে লিখেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ নিয়ে এ যাবৎ জল কম ঘোলা হয়নি। সকল প্রকার যুক্তিতর্ক অগ্রাহ্য করে, সকল সম্ভব-অসম্ভবকে অস্বীকার করে কল্পনাপ্রবণ কিছুসংখ্যক লোক ২৫ মার্চের ভয়াবহতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করে থাকেন। কীভাবে বঙ্গবন্ধু এই ভয়াবহতার জন্য দায়ী তা তাদের দাবিতে অন্তঃসারশূন্য এবং প্রমাণে ব্যর্থ। তাদের যুক্তিতর্ক অত্যন্ত দুর্বল এবং সেটা শুধু বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা। গত কয়েক বছর ধরে বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে- কেন ২৫ মার্চ কালরাতে বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে গেলেন না? বিষয়টি আমাকে এতটাই বিভ্রান্ত করেছে যেÑ আমারও এক সময় মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে গেলে তাকে পাকিস্তান আর্মি গ্রেফতার করতে পারত না, তিনি আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারতেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে এত বেশি সময় লাগত না, এত লোকক্ষয় বা সম্পদের হানি হতো না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সে বিভ্রান্তি কাটতে বেশি সময় লাগেনি। এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ৬ বছর। মুক্তিযুদ্ধের কথা আমার সামান্য কিছু কিছু মনে আছে। আমি ও আমার বড় বোন একজন প্রতিবেশির সাথে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম- সারাদিন না খেয়ে আমরা ধানক্ষেতের আল ধরে বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে চলে গিয়েছিলাম। এছাড়া পাকিস্তানিরা রাস্তা দিয়ে চলাফেরার সময় আমরা বাড়িতেই আত্মগোপন করে থাকতামÑ এ রকম কিছু ঘটনা আমার মনে পড়ে।’

এভাবেই আমরা একজন বালকের স্মৃতির চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা পাই ‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইয়ে। এবং তা হয়ে উঠে ওই সময়কার প্রামাণ্য দলিল। লেখক তপন দেবনাথের মতো অগ্রণীরাই মুক্তিযুদ্ধকে হারাতে দেন না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেন। এভাবেই ঋণ শোধ হয় সবার।

‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বইটির প্রতিটি পরিচ্ছেদে পাঠক মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা কিছু জানতে পারবেন। লেখক তপন দেবনাথ তার সুন্দর কাব্যসুলভ গদ্যে চোখের সামনে নিয়ে আসেন যুদ্ধকে। নিয়ে আসেন ওই সময়কার বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে। নিয়ে আসেন অনেকের ত্যাগের কথা।

‘জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ’ পরিচ্ছেদে তিনি লিখেন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে প্রতিবেশি ভারতের অবদান, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর প্রচেষ্টার কথা। বইটির ৬৭ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেন, ‘আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও ত্যাগের কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। দেশকে শত্রুমুক্ত করতেই হবে- এই প্রাণপণ প্রতীজ্ঞা তাদের সফলতা এনে দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল শূন্য হাতে।’ তিনি আরো লিখেন, ‘এ কথা অনস্বীকার্য যে, ভারতের সহযোগিতা বিশেষ করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থন ও সহযোগিতা না থাকলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এত তাড়াতাড়ি শেষ হতো না। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রায় ৩ হাজার ৯০০ বীর সেনানি প্রাণ বিসর্জন দেয়।’ একটি অগ্রণী দায়িত্ব পালন করেছেন লেখক তপন দেবনাথ। দেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের কতটুকু অবদান তা বলেছেন। অনেকেই প্রতিবেশি দেশটির অবদান স্বীকার করতে চান না। এ আমাদের হীনমন্যতা। প্রকৃত সত্য বলেছেন তপন দেবনাথ, ‘যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন ভারত নামটি বাংলাদেশের নামের সাথে জড়িয়ে থাকবে।’ এ পরিচ্ছেদে তিনি মুক্তিযুদ্ধে জগজিত সিং অরোরার অবদানের কথাও তুলে ধরেন। যিনি ওই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে ১৬ ডিসেম্বর তিনি মিত্রবাহিনীর পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ সম্পর্কীয় দলিল গ্রহণ করেন।

গ্রন্থটির ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- বাংলাদেশের উন্নয়নই যার একমাত্র স্বপ্ন’ পরিচ্ছেদে তপন দেবনাথ লিখেন, ‘ভূ-প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। তার ওপর অল্পশিক্ষা, অশিক্ষা, ধর্মীয় উন্মাদনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নের চাকাকে কখনো স্থবির, কখনো বা একেবারে অচল করে দেয়। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে নিরলস সংগ্রাম করে বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে যিনি নিয়ে গেছেন, তাঁর নাম জননেত্রী শেখ হাসিনা। যে কোনো দুর্যোগে, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সামান্যতম বিচলিত না হয়ে, মৃত্যুকে তুচ্ছ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া অসীম সাহসের প্রতীকের নাম শেখ হাসিনা।’

তিনি আরো লিখেন, ‘কীভাবে সমস্যা মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে হয় বাংলাদেশ তা শিখে গেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্য কারিগরের নাম শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাই দেখিয়েছেন- ঝিমিয়ে পড়ার নাম জীবন নয়, ছুটে চলার নামই জীবন। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়ন আমাকে আপ্লুত করে এই দেখে যে, শহুরে নারীদের থেকে গ্রামীণ নারীরা এখন বেশি উপার্জন করে।’

বইটি মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তবু লেখকের মুন্সিয়ানা ও অপূর্ব স্মৃতিচারণায় শেষ পরিচ্ছেদে আজকের প্রধানমন্ত্রীর কথাও প্রাসঙ্গিক ঠেকেছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ ধরেই তো আধুনিক বাংলাদেশ গড়ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তাই তার কথা আসবেই। আবার মুক্তিযুদ্ধ আসলে মুজিব আসে। আর মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপকার আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এবার লেখক তপন দেবনাথের আরো কিছু পরিচয় দেওয়া যাক। তিনি ১৯৬৫ সালের ৫ মে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানার বড় মনিকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হরেকৃষ্ণ দেবনাথ, মাতা চিন্তামণি দেবী। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করতেন তপন। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা আসেন। ১০ বছর চাকরি করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনে। ওই সময়ই বিএ পাশ পরেন। ২০০১ সাল থেকে তিনি সপরিবারে আমেরিকার লস এঞ্জেলসে প্রবাস জীবন যাপন করছেন।

‘রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ ঐতিহাসিক গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। ধ্রব এষের আঁকা চমৎকার প্রচ্ছদে কিরীটি বিশ্বাসের একটি পেইন্টিং ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে শেখ মুজিবের অবিচল একটি পোট্রেট আছে। ৯০ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৮০ টাকা। বইটি প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। পাঠক বইটি আপনার মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে জানার অদম্য আগ্রহে অনেকটা খাদ্য হতে পারে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।

মন্তব্য লিখুন :