দুই সেমিস্টার এক করে ঢাবির সেশন জট কাটানোর পরিকল্পনা

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৫৮
ঢাবি প্রতিনিধি

করোনা মহামারীতে সেশন জটের বিষয়টি নিয়ে ভাবছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সেমিস্টার পদ্ধতিতে পরিচালিত বিভাগগুলোতে দুই সেমিস্টার এক করে চলমান সেশনটি সংক্ষিপ্ত আকারে শেষ করা সম্ভব বলে মত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। বাৎসরিক পদ্ধতিতে পরিচালিত বিভাগগুলোতে সেশন সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।  

করোনা মহামারীর কারণে গত ছয় মাস ধরে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়টি। অনলাইন ক্লাস শুরুর পর আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের নানা সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা নিরসন করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনলাইনে নেওয়া ক্লাসের কার্যকারিতা ও ফলপ্রসূতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে সেশন জটের দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে শিক্ষার্থীদের।

গত ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হলে ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সে হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে, যা একটি পূর্ণ সেমিস্টার শেষ করার সময়ের সমান। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরিকল্পনা নেই কর্তৃপক্ষের। স্বাভাবিকভাবেই ছয় মাস থেকে পূর্ণ একবছরের সেশন জটে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। 

এদিকে গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পুরোদমে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগ। ক্লাস শুরুর পর থেকেই অভিযোগ আসতে থাকে, শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, নেটওয়ার্ক সমস্যাসহ বেশকিছু কারণে ক্লাসে অংশ নিতে পারছেন না। এ ছাড়া অনলাইন ক্লাসসমূহের কার্যকারিতা ও ফলপ্রসূতা নিয়েও অভিযোগ আছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪৯টি বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু আছে। এই পদ্ধতিতে প্রতি ছয় মাসে একবার করে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হয়। এভাবে আটটি সেমিস্টারে স্নাতক ও দুই সেমিস্টারে স্নাতকোত্তর করতে হয়।

এদিকে, অনলাইন ক্লাস শুরুর প্রায় আড়াই মাসের মাথায় শিক্ষার্থীদের মোবাইল ডাটা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। 

একাধিক বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরুর দিকে অনলাইন ক্লাসে মোটামুটিসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও ধীরে ধীরে এই সংখ্যা কমতে থাকে। এখন এক-তৃতীয়াংশেরও কম শিক্ষার্থী ক্লাসে সংযুক্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাইয়ুম আনান বলেন, ‘যদিও পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পক্ষে নয়। এ সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সেশন জটের আশঙ্কা আছেই। প্রায় শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ এভাবে থমকে যাওয়াটা অনেক কিছুকেই প্রভাবিত করছে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাদ্দিক বিল্লাহর দাবি, অনলাইন ক্লাস নিয়মিত ক্লাসের মতো ফলপ্রসূ নয়। তিনি বলেন, মার্চ থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর- প্রায় সাত মাস একাডেমিক কার্যক্রম থেমে আছে। অনলাইনে ক্লাস হলেও তা বাস্তবের ক্লাসের মতো কার্যকর নয়। এ ছাড়া আমার অনেক সহপাঠী কোনো ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ কে এম মাকসুদ কামাল জানান, সেশন জট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে ক্লাস নেওয়া, বাৎসরিক বন্ধের দিনগুলোকে কমিয়ে নিয়ে আসাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ রয়েছে আলোচনায়।

অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, ‘একটি সুযোগ আমাদের আছে। চলমান সেশনটিকে শেষ করার জন্য সব বিভাগের ক্ষেত্রেই এই সেশনের দুটো সেমিস্টারকে এক করে অনেকটা বাৎসরিক পদ্ধতিতে সংক্ষিপ্ত আকারে শেষ করা যেতে পারে।’

অধ্যাপক মাকসুদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরপরই কিছু রিভিউ ক্লাস নিয়েই ক্ষতি হয়ে যাওয়া সেশনের পরীক্ষা নিয়ে নেব আমরা। পরবর্তী সেশনের ক্ষেত্রে সেমিস্টারগুলোর সময়কাল চার মাস করে আট মাসে নিয়ে আসব। এভাবেই মূলত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।’

তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে অনলাইন ক্লাসের বিকল্প নেই। তার দাবি, শিক্ষার্থীরা চাইলেই অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘সারাবিশ্বের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসজনিত সমস্যার মুখোমুখি। বর্তমানে অনলাইন ক্লাসের বিকল্প নেই। কিছু শিক্ষার্থীর আর্থিক অনটনসহ বিভিন্ন সমস্যাকে আমি মোটেও উপেক্ষা করছি না। তবে আগ্রহী হলে যেকোনো উপায়েই তারাও অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগেই বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরপরই কয়েক সপ্তাহ রিভিউ ক্লাস নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে যারা অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না, তারা ক্ষতিটুকু পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।’

সবশেষ সিন্ডিকেট সভায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডাটা সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মাকসুদ কামাল। তিনি বলেন, সবশেষ সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ডাটা কিনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সহায়তা করলে সেটাও নেওয়া হবে।

উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্য ধরাই এখন আসল কাজ। বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর কিছু ত্যাগ করা অযৌক্তিক হবে। 

ড. সামাদ বলেন, ‘এই ধরনের সমস্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একবছর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপরও অনেক ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছে। কিন্তু পরে আমরা ঠিকই সেশন জট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। এমন ঘটনাও আছে, দুটো শিক্ষাবর্ষ এক করে ভর্তি করানো হয়েছে। যেমন- ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। জীবন মূল্যবান। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

ড. মুহাম্মদ সামাদ অনলাইন ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তা মোটেও সমর্থন করছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম, কেউ অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে, কেউ পারছে না। এই বিষয়টিকে আমি সমর্থন করি না। আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তি হয়, তাদের সবার শিক্ষা লাভের সমান অধিকার কাছে। কাজেই খণ্ডিতভাবে এগুলো হবে না।’

মন্তব্য লিখুন :