জেএমবি ক্যাডার থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বেলাল!

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:০৪
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি

নওগাঁর রাণীনগরে বাংলা ভাইয়ের একান্ত সহযোগী জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি থেকে উপজেলার স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হয়ে গেছেন মো: বেলাল কাজী ওরফে মুন্সি (৩৬) নামে এক যুবক। এক সময়ের জেএমবি ক্যাডার কী করে আ’লীগে যোগ দিয়ে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন ও সমালোচনা। বহুল আলোচিত কাজী বেলাল হোসেন জেলার রাণীনগর উপজেলার বড়গাছা ইউনিয়নের গহেলাপুর গ্রামের বড়িয়াপাড়ার নাজিম উদ্দীনের ছেলে।

বেলাল নিজ শিক্ষকের সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে ২০০৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিকাহ রেজিস্ট্রার হলেও তদন্তে ধরা পড়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সেই লাইসেন্স বাতিল করে এবং এ নিয়ে আদালতে নিয়মিত মামলা হয় যা বর্তমানেও চলমান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেলাল হোসেন রাণীনগর আল-আমিন দাখিল মাদ্রাসার ছাত্র থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে রাণীনগর-আত্রাইয়ে আর্বিভাব হওয়া বাংলা ভাইয়ের দলে যোগ দিয়ে এলাকায় হত্যা ও লুটপাটসহ নানা সন্ত্রাসী কার্মকান্ড চালান। এক পর্যায়ে বাংলা ভাইয়ের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী তৎকালীন রাণীনগর উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা ইদ্রিস আলী খেজুরকে সিম্বা গ্রামের তার বড় বোন রেনুকা বেগমের বাড়ি থেকে ২০০৪সালের ১৮মে সকাল ১০টার দিকে প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। পরে উপজেলার ভেটি মাদ্রাসার পাশে ধানের জমির মধ্যে লাশ পুঁতে রাখা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বোন মোছা. লিলিমা আক্তার বাদী হয়ে রাণীনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (নং-২১/২০০৪, তাং ২৮-০৫-২০০৪ইং, ধারা: ১৪৩/৪৪৮/৪২৭/৩৪২/৩৪৩/৩৬৪/৩২৩/৩২৫/৩০২/২০১/৩৪দ:বি:)। পরবর্তীতে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩১ মার্চ চার্জশিট দেয়। চার্জশিটে অন্যান্য আসামিসহ মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সিকে ২৪ নং পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অপরদিকে খেজুরের বোন লিলিমা আক্তার ২০০৮ সালে আদালতে যে নারাজি পিটিশান দাখিল কলে সেখানেও বেলালের নাম উল্লেখ করা হয়।

নিহত ছাত্রলীগ নেতা ইদ্রিস আলী খেজুরের বোন লিলিমা আক্তার বলেন, বাংলা ভাইয়ের পতন হলে ঘাপটি মেরে থেকে তৎকালীন সরকারের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে গা বাঁচিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পর্যন্ত দিন পার করেন বেলাল। পরবর্তীতে বর্তমান আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে খোলস পাল্টিয়ে আ’লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীদের সাথে প্রকাশ্য ঘোরাফেরা এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করেন বেলাল। এক পর্যায়ে গোপনে আঁতাত করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। এরপর থেকে আ’লীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। কিন্তু সরকার আমার ভাইয়ের হত্যাকারী বেলাল কাজীর এখন পর্যন্ত কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলো না, এটা খুবই দু:খজনক।

বেলঘরিয়া কাচারি গ্রামের ভুক্তভুগি আব্দুল মোতালেব বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় কাজী না হয়েও অবৈধভাবে বাল্যবিবাহ, ভুয়া তালাক, কাবিন জালিয়াতি, মরা মানুষের সাথে ভূয়া কাবিন নামা তৈরির মতো একের পর এক জঘন্য কাজ করে চলেছে বেলাল। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। কাজী বেলাল প্রবাসে থাকা আমার স্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করে আমাদের মাঝে ছাড়াছাড়ি করিয়েছেন। কিভাবে এটা সম্ভব তা আমার জানা নেই।

এদিকে জেএমবি ক্যাডার ও ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি তুলেছে সচেতন মহল। তাদের দাবি, কার মাধ্যমে এবং কিসের বিনিময়ে তাকে দলে নেওয়া হলো তা দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার।

মো. বেলাল কাজী ওরফে মুন্সি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন, তবে কেন ও কোন কারণে তাকে দলে নেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি নন বলে মুঠোফোনে জানান।

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে যখন কমিটি গঠন করা হয় তখন তো আমি নিজেও একজন প্রার্থী ছিলাম। তাই কমিটিতে কাকে কোন পদ দেওয়া হচ্ছে তা জানা সম্ভব নয়। এটি নির্ধারণ করেন স্থানীয় সাংসদ, জেলা ও উপজেলার নেতৃবৃন্দ। তবে দলে এমন লোকের স্থান কাঙ্খিত নয়। কাজী বেলাল সম্পর্কে উপযুক্ত প্রমাণাদী পেলে দলের উর্দ্ধতন ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য লিখুন :