রেলওয়ের আড়াই হাজার লেভেলক্রসিং, অনুমোদিত মাত্র ৭৮০

১৩ অক্টোবর ২০২০, ০১:৫৮
অনুসন্ধান প্রতিবেদক
সারাদেশে রেলওয়ের লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৪১টি। এরমধ্যে অনুমোদিত মাত্র ৭৮০টি-ছবি সংগৃহীত

সারাদেশে রেলওয়ের লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৪১টি। এরমধ্যে অনুমোদিত মাত্র ৭৮০টি। বাকি এক হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং এখন মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

গত শনিবার ফেনীর ফতেপুরে অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে চট্টগ্রামগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে এনআর পরিবহনের বাসের সংঘর্ষে ৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন।

রেলওয়ের দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে অনুমোদনহীন লেভেলক্রসিংয়ে। চলতি বছর করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যুহার কমলেও ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিমাসে গড়ে ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে লেভেলক্রসিংয়ে। এ ছাড়া অরক্ষিত ক্রসিংয়ে প্রায় সময় ট্রেনের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

আবার অনুমোদিত ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার কারণ জনবল সংকট। সংরক্ষিত ৭৮০টি ক্রসিংয়ে নিয়মিত গেইটকিপার রয়েছে অর্ধেকেরও কম। তাই এসব ক্রসিংয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কোনো কর্মী না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। 

দেশের অধিকাংশ লেভেলক্রসিং এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যানবাহন চলাচলের কারণে যাতে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য বাড়তি একটি রেলের পাত দিয়ে রেললাইনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর যানবাহন ও মানুষ পারাপারের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ সতর্কবাণী সংবলিত সাইনবোর্ড দিয়েই দায় সেরেছে।

এ ছাড়া বেশিরভাগ ক্রসিংয়ে গেটকিপার নেই। ট্রেন আসার আগে গেটবার (বেরিয়ার) ফেললেও পারাপারের সময় যানবাহন ও পথচারীরা অপেক্ষা করতে চান না। রেলগেট তুলে ছোট যানবাহন ও মানুষ চলাচল করলেও নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ ও গেটকিপার কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

অথচ রেলওয়ের আইন অনুযায়ী, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে মোট ২০ ফুট এলাকায় যেকোনো মানুষ প্রবেশ করলে তা আইনত দ-নীয় অপরাধ। এমনকি ২০ ফুটের মধ্যে কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করলেও আটকের মাধ্যমে বিক্রি করে রেলওয়ের কোষাগারে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক স্বপন কুমার পালিত বলেন, ‘দেশে জনসংখ্যা ও গাড়ির সংখ্যা বেশি। তাই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকলেও সম্ভব হয় না। যারা এসব ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সংখ্যা খুবই কম। এদের মধ্যে আবার অনেকে আইন অমান্যকারীদের শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেন।’

তিনি বলেন, লেভেলক্রসিংগুলো যেখানে থাকার দরকার সেখানে নেই। যত্রতত্র ক্রসিং থাকা এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে চায় না। দুর্ঘটনা কমাতে চাইলে অবৈধ ক্রসিং বন্ধ করে অনুমোদিত ক্রসিংয়ে গেটকিপার দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।  

যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর অরক্ষিত এসব ক্রসিংয়ে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এ ছাড়া নিয়মিত গেটকিপার না থাকায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো যাচ্ছে না। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে গেটকিপার নিয়োগ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) স্নেহাশীষ দাশ গুপ্ত বলেন, ফেনীর ফতেপুরে দুর্ঘটনাস্থলের ওই লেভেলক্রসিংয়ে ওপরে ফ্লাইওভার থাকার পরও তা ব্যবহার করেনি। মূলত যানবাহন চালকদের উদাসীনতা ও জনগণের সিগন্যাল অমান্য করে রেললাইন পার হওয়ার কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। ট্রেন যাওয়ার সময় যখন গেটবার ফেলা হয়-তখন দেখা যায়, অনেক যানবাহন চালক নিষেধ অমান্য করে রেললাইন অতিক্রম করছে।

তিনি বলেন, লেভেলক্রসিং থাকলেও গেটকিপারের অভাব রয়েছে। আমাদের বিশাল জনবল দরকার। মঞ্জুর হওয়া পদে নিয়োগ দিতে পারলে ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে। 

মন্তব্য লিখুন :