মাদরাসা শিক্ষা: অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ

২১ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৬
লাবীব আব্দুল্লাহ

বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো দুই ধরনের৷ কওমী ও আলিয়া৷ কওমী মাদরাসা দেওবন্দি চিন্তাধারা লালন করে৷ আলিয়া মাদরাসার চিন্তাধারায় কী কী বিষয় তা আমার জানা নেই৷

১৭৮০ সাল থেকে আলিয়ার যাত্রা৷ আলিয়ার আগে উপমহাদেশে হাজার হাজার মাদরাসা ছিলো৷ ৮০ হাজার মকতব ছিলো৷ সেই সময়ের মাদরাসাপড়ুওয়ারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারতো৷ দীন শিখতো দুনিয়াও৷ বিচারপতির দায়িত্ব পালন করতো মাদরাসাপড়ুওয়ারা৷ প্রশাসনের দায়িত্বও পালন করতেন৷

ইংরেজ বেনিয়ারা এসে মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে৷ লা খেরাজ ভূমি বাতিল করে দখল করে৷ ইসলামী শিক্ষার ধবংসের সকল আয়োজন তারা বাস্তবায়ণ করে৷ সংগ্রামী আলেমদের অমানসিক নির্যাতণ করে৷ বিপ্লবী আলেমদের আন্দামান দীপে নির্বাসিত করে৷ হামলা মামলা হুলিয়া জারি করে সংগ্রামী আলেমদের বিরুদ্ধে৷ ইস্ট ইন্ডিয়া কোং শিক্ষাবান্ধ ছিলো না৷ মুর্খ মিশনারিরা ধর্মের নামে ভন্ডামি প্রচার করে সাম্রাজ্যবাদীদের পথ তৈয়ার করে দিতো৷ ত্রিত্ববাদের ধাঁ ধাঁয় ধোকা খেতো সাধারণ জনতা৷

ইংরেজরা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার দেখে উপমহাদেশের সম্পদ লুন্ঠন করতে আসে৷ লোভাতুর থাবায় বিধ্বস্ত হয় উপমহাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি৷ নীলকরের ইতিহাস জালেমদের ইতিহাস৷ মসলিন ধ্বংসের ইতিহাস কষ্টের ইতিকথা৷ কৃষকদের প্রতি অমানবিক জুলুম করে ইংরেজরা৷ জমিদারি প্রথায় কত কান্না ছিলো কৃষকদের৷ হিন্দু জমিদারদের জুলুমের গল্প দীর্ঘ৷ ইংরেজদের তল্পিবাহক মুসলিম নামের লোকগুলোও মুনাফিকি করেছে পলাশীর আমবাগানে৷

১৭৫৭ সালের করুণ সেই ইতিহাস৷ মীরজাফর মীরসাদেকরা প্রকৃত কপট ছিলো৷ দেশপ্রেমীরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে ইংরেজ দুষ্টচক্র ও কপল মুসলিমদের হাতে৷ সেই ধুর্ত বেনিয়ারা এই দেশে কেরানি তৈয়ারের ফেক্টুরি প্রতিষ্টা করে৷

চিন্তায় প্রতিবন্দী কিছু লোক তৈয়ার করতে প্রতিষ্টা করে স্কুল কলেজ৷ উদ্দেশ্য কেরানি উৎপাদন৷ কিছু ধান্ধবাজ তৈয়ার করতে ইসলামী শিক্ষার নামে তৈয়ার করে আলিয়া মাদরাসা৷ প্রথম ২৭জন পরিচালক আবার সেই ইংরেজরাই৷

তারা শিক্ষায় বিভাজন করে৷ মোল্লা তৈয়ারে আলিয়া৷ মিস্টার তৈয়ার করতে স্কুল কলেজ৷ স্যার সৈয়দ আহমদের জন্য আলীগর মুসলিম কলেজ৷ আলীগর বিশ্ববিদ্যালয়৷

ডিভাইড এন্ড রুল নীতি বাস্তাবায়ণ করে৷ সাম্প্রদায়্তার বীজ রোপন করে৷ হিন্দু মুসলিমের মাঝে বিরোধের বীজ রোপন করে সেই বেনিয়া গোষ্ঠীরাই৷ মুসলিমদের মুসলিমলীগ হিন্দুদের হিন্দুমহাসভা, কংগ্রেস৷ মোগল আমলের সেই হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির বসবাস আর সম্ভব হয় নাই ইংরেজদের কূটচালের পর৷ ধর্মের নামে কলেজ৷ হিন্দুদের জন্য পৃথক মুসলমানদের জন্য আলাহেদা কলেজ৷

এই ইতিহাস কষ্টের৷ এই ইতিহাস নষ্টের৷


দুই

১৯০ বছর শাসন করে ইংরেজরা৷ পলাশী, বালাকোট, বাঁশেরকিল্লা, শামেলি সিপাহী বিপ্লব আরও কত অধ্যায় সংগ্রামের৷ হিংস এবং অহিংস কত আন্দোলন ইংরেজ হটাওয়ের জন্য৷ কালাপানি, আন্দামান সংগ্রামীদের আবাদ করার ইতিহাস৷ বহু বর্ণের, বহু জাতির, বহু সংস্কৃতির এই উপমহাদেশের সৌন্দর্য ক্ষত বিক্ষত করেছে ইংরেজরা৷ লুট করেছে আমাদের সম্পদ৷ স্বর্ণপ্রসবিনী এই উপমহাদেশকে তারা ভোগ করেছে৷ সেই বাহাদুর শাহ জাফরের কী করন ইতিহাস৷ মীর্জা গালিবের কত মর্মস্পর্শী দুঃখের কাব্য৷

চাঁদনির চকে গাছে গাছে সংগ্রামী আলেমদের ফাঁসি দিয়েছে৷ এ দেশের জনতাকে নির্যাতণ করেছে৷ বৃটিশের সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেতো না তখন৷ এখন তাদের ভাগ্যের সূর্য উদিত হতে আমেরিকার প্রয়োজন পড়ে৷ তল্পিবাহক আমেরিকার৷ সংকোচিত তাদের রাজ্য৷ সেই রাজা রাণী আজ ফর শো৷ শোভা শুধু৷ 

বৃটিশ বেনিয়ারা উপমহাদেশের রাজভাষা ফার্সির পরিবর্তণ করে ইংরেজি চালু করে৷ দিল্লির শত শত মাদরাসার ভবন গুড়িয়ে স্কুল কলেজ করে৷ লর্ড ম্যাকলের কেরানি তৈয়রির ফর্মুলার বাস্তবায়ণ হয় সফলভাবে৷ সংগ্রামী বিদ্রোহী উলামায়ে কেরাম বালাকোট শামেলির পর গ্রামে একটি মাদরাসা করেন৷ ভারতের উত্তর প্রদেশে৷ দারুল উলুম দেওবন্দ নামের মাদরাসা৷ যা ছিলো সংগ্রামী আলেমদের দূর্গ৷ আল্লামা কাসেম নানুতবী রহ ও তাঁর শিক্ষাবিদ সাথীরা প্রতিষ্ঠা করেন সংগ্রামের সেই দূর্গ৷ যেখান থেকে জন্ম নেন সংগ্রামী আলেম শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান রহ৷ ইংরেজবিরোধী অকোতভয় এক সংগ্রামী সাধক৷ যিনি কারাগারের লৌহ কপাটেও সংগ্রাম, মুক্তি ও স্বাধীনতার গান গেয়েছেন৷

মূলত দেওবন্দ শুধু একটি প্রথাগত মাদরাসা নয়৷ এটি ইসলামকে বিজয়ী করার সকল প্রকার সংগ্রামের পাঠশালা৷

বিশ্বময় ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র৷ সত্যের পথে সংগ্রােমর দূর্ভেদ্য দূর্গ৷ যদিও তা অনেকে জানেন না৷ জানলেই এটি একটি মাদরাসা বা প্রথাগত খানকা মনে করেন৷ কিন্তু দারুল উলুমের প্রতিষ্টাতাদের চিন্তাধারা সে কথা বলে না৷ দর মাদরাস খানকা দিদাম এটিও ঠিক কিন্তু বালাকোটের ধারাবাহিতারই অংশ দারুল উলুম দেওবন্দ৷ চেতনায় বালাকোট৷ চেতনায় মক্কী জীবন নবীজীর৷ চেতনায় মাদানী জীবন রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের৷


তিন

উপমহাদেশে আলিয়া মাদরাসার জন্মদাতা ইংরেজরা৷ তবে এই আলিয়া মাদরাসা থেকে এক সময় বড় বড় মুহাদ্দিস তৈয়ার হয়েছে এটি অস্বীকার করা যাবে না৷ লেখক তৈয়ার হয়েছেন৷ দাঈ তৈয়ার হয়েছেন৷ কিন্তু সেই আলিয়া মাদরাসা ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়ে কলকাতা আলিয়া ও ঢাকা আলিয়া হয়ে যায়৷ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের সময় এক তত্ত্বের আলিয়াও দ্বিখন্ডিত হয়৷

আলিয়া মাদরাসার ইতিহাস নামের এক বইয়ে আলিয়ার বিস্তারিত অতীতের কথা আছে৷ আমরা যদি বর্তামান আলিয়া মাদরাসা দেখি তাহলে ইংরেজদের মতলবেব বাস্তাবায়ণ দেখতে পাই৷ ভারতের আলিয়া মাদরাসায় এখন হিন্দু ছাত্র ছাত্রীরাও পড়ার সুযোগ পায়৷ মমতা সরকার অনের মমতা করেছে আলিয়া মাদরাসায়৷ নিয়োগ পায় হিন্দু শিক্ষকও৷ চরম ও পরম উদারতা এটি৷ কিন্তু হিন্দু ধর্ম শিক্ষার জন্য মুসলিম শিক্ষক নিয়োগ দিলে উদরাতার পূর্ণতা হতো৷ আসৱ অসম্প্রদায়িক চিন্তার বাস্তবায়ণ হতো৷ কিন্তু তাহা হবে না কখনও৷ বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসার হাসি কান্নার ইতিহাস সবারই জানা৷ সেই আলিয়া ওল্ডস্কীম, নিউস্কীম ভার্সনের কথা অনেকেই জানেন৷ নিউস্কীমের হাই মাদরাসা একদিন রুপান্তরিত হয় হাই স্কুলে৷ ইবতেদায়ী মাদরাসার প্রতি চরম অবহেলার কথা কে না জানেন৷ অনেক সংগ্রাম করে দাখিল, আলিম, ফাজেল কামিলের সনদের মান হয়েছে অনার্স লেভেলের৷ কিন্তু আলিয়ার হাত পা কর্তণ করা হয়েছে ধারালো চাকু দ্বারা৷ ক্ষত বিক্ষত৷ রক্তাক্ত দেহ আলিয়ার৷ কিছু শিক্ষক কর্মচারি চলছেন আলিয়া মাদরাসার বেতন ভাতায়৷ কিন্তু মাদরাসা থেকে তো হাফেয ও আলেম হবার কথা৷ আলেম কি হচ্ছেন কেউ? মুহাদ্দিস মুফাক্কির হবার কথা মাদরাস থেকে৷ কিন্তু তা কি হচ্ছেন কেউ? বর্তমান সিলেবাস কি আলেম হবার উপযোগী? স্কুলের সিলেবাস তাহলে কী দোষ করলো৷ আলিয়ার দাখিল পর্যন্ত সিলেবাস তো স্কুলের ফটোকপি৷ কিছু ব্যতিক্রম আরবী কয়েকটি কিতাব৷

সরকারি মান নিতে গিয়ে বগা ফান্দে পড়ে কান্দে দশা আলিয়ার৷ উত্তরণের চিন্তা না আলিয়া মাদরাসা নামে থাকলেও বাস্তবে তা হবে স্কুল কলেজের ফটোকপি৷ হাই মাদরাসার পরিনাম৷ আল্লাহ না করুন৷ মাদরাসার ঐতিহ্য স্বকীয়তা বজায় থাকবে এই দাবি ও প্রত্যাশা৷


চার

দেশের স্কুল কলেজ ভার্সিটির স্কলাররা দেশ পরিচালনা করেন৷ আলিয়া মাদরাসা থেকে শিক্ষকতা, কাজিগিরির পাশাপাশি ইদানিং কেউ কেউ প্রশাসনেও আছেন৷ তবে হিকমতে আমলি ও কৌশলের কারনে সেইসব আলিয়াপড়ুওয়াদের পোষাকে পরিচয় পাওয়া দুস্কর৷ তাছাড়া দাখিলের পর কলেজ ভায়া বিসিএস৷

কওমীর জন্য লাখ লাখ মসজিদ এবং হাজার হাজার মাদরাসা আছে৷ প্রশাসনের কোনো দরজা তাদের জন্য খোলা নহে৷ যদিও এক সময় এই কওমী মাদরাস বা দীনি মাদরাসার স্কলারগনই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন৷ মুসলিম উম্মাহর খেলাফতের ইতিহাস সে কথাই বলে৷ তবে দেওবন্দ থেকে যে কওমীর শুরু সেটির ইতিহাস ভিন্ন৷ আমরা আগে ইংরেজবিরোধী ছিলাম৷ ভাবটা এখন মুসলিম প্রশাসনকেও ইংরেজ মনে করি তাই দূর দূরে বহু দূরে৷

ইংরেজ হটিয়ে পাকিস্থান করলেন উলামায়ে কেরাম কিন্তু যেই পাকিস্থানের কোনো প্রশাসনে নেই এই হযরত উলামায়ো কেরাম৷ কেন নেই তা এক রহস্য৷ দেশ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ৷ লাল সবুজের পতাকা চাঁদ সেতারার বদলে কিন্তু আমরা সেই ইংরেজ আমলের মতোই বিরোধী৷ মিম্বর ও মেহরাবই আমাদের প্রশাসন৷ কিন্তু সেটি এখন জাহেল আওয়াম টাকাওয়ালাদের দখলে৷ কিন্তু আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে আনন্দেই আছি৷ ইসলামের ইতিহাসে আলেমদের এতো দুর্দিন কোনো কালেই ছিলো না৷ এতো চিন্তার জড়তা কোনো কালেই ছিলো না৷ মাদরাসা শিক্ষাকে চার দেওয়ালের জন্য করার এই ষড়যন্ত্র কে করছে? মাদরাসা তো সব দেয়ালের জন্যই ছিলো৷ সব অঙ্গনের জন্যই৷ সব পদের জন্য৷ সকল প্রশাসনের স্তরের জন্য৷ তিন্তু কেন কী কারণে আমাদের হাজার বছরের মাদরাসা শিক্ষা চার দেয়ালে আবদ্ধ তা ভাবতে হবে৷ ভাবতে হবে অতীত নিয়ে৷ পরিকল্পনা করতে হবে আগামীর৷ কেমন হবে একুশ শতকের মাদরাসা৷ কী হবে সিলেবাস৷ কী হবে রুপরেখা৷ একুশ শতকের চাহিদা ও দাবি পূরণে মাদরাসা শিক্ষা কী ভূমিকা রাখবে তা নিয়েও ভাবতে হবে৷

ভাবনার জানালা উন্মুক্ত৷

এই ভাবনায় অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ থাকবে৷

তারুণ্যর স্বপ্ন থাকবে৷ স্বপ্নের বাস্তবায়ণে কর্মসূচি থাকবে৷ বিশ্বসমস্যার সমাধান থাকবে এই ভাবনায়৷


লাবীব আব্দুল্লাহ, মাদরাসা ইবনে খালদুন ময়মনসিংহ

মন্তব্য লিখুন :