একুশে আগস্ট হামলা : বিরোধী মতের বিপক্ষে বিভীষিকা

২২ আগস্ট ২০২০, ২০:২৭
সোহেলী চৌধুরী
সোহেলী চৌধুরী

বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৬তম বার্ষিকী পার করেছে জাতি। এ এক কলঙ্কময় দিন। ২০০৪ সালের এদিন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে সরকারি দলের মদদে কতিপয় অন্ধ গোষ্ঠী। তারা কতটা অন্ধ হয়েছিল তার সাক্ষী জাতি। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে বলা যেতে পারে এর পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল। আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তিনি তখন ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা।

বাংলাদেশকে পেছনে ঠেলে ধরা কতক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এদিনটির মাধ্যমে ভিন্ন বাংলাদেশ গড়ার অপপ্রয়াস চালায়। মহান আল্লাহতালার অশেষ কৃপায় এবং দলের নেতাকর্মীর মানবব্যুহের সুরক্ষায় শেখ হাসিনা সেদিন বেঁচে যান। কিন্তু আজীবনের তরে শ্রবণশক্তিতে আঘাত পান।

একটু ফিরে দেখলে সেদিনকার বিভীষিকার নমুনা সামনে চলে আসে। যদিও এমন নমুনা চোখের সামনে না আনাই শ্রেয়। তবু ইতিহাস কিছু বাদ দেয় না।

এখন কথা থাকে এমন কেন করল বিএনপি-জামায়াত শাসিত তখনকার সরকারের মদদে কিছু অমানুষ। বলা যায় তারা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। তাদের কোনো বিরুদ্ধ মত সহ্য হয় না। বিরুদ্ধ মতের চূড়ান্ত মুলোৎপাটন চায় ওই গোষ্ঠী।

সরকারের ভুলত্রুটি ধরে সমালোচনা করে বিরুদ্ধ মত বা বিরোধী দল। এতে করে সরকার ভুলগুলো থেকে সরে এসে সঠিক পথে চলে আসে। সেই হিসেবে বিরুদ্ধ মতই সরকারের সহায়ক শক্তি। কিন্তু ওই সময়কার সরকারি দলের মদদে কিছু পাষন্ড মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করে। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সেদিন ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ শান্তি মিছিলের আয়োজন করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।

আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি মিছিলের আগে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে স্থাপিত অস্থায়ী ট্রাকমঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহুর্মুহু ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় মুহূর্তেই মানুষের রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে।

স্প্লিন্টারের আঘাতে মানুষের হাত-পাসহ বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। সভামঞ্চ ট্রাকের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় রক্তাক্ত নিথর দেহ। লাশ আর রক্তে ভেসে যায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর সামনের পিচঢালা পথ। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেসে আসে শত শত মানুষের গননবিদারী আর্তচিৎকার। বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টারত মুমূর্ষুদের কাতর-আর্তনাদসহ অবর্ণনীয় মর্মান্তিক সেই দৃশ্য। সেদিন রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালে আহতদের তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ভাগ্যগুণে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনার দুই কানের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন দেখে তার গাড়ি লক্ষ্য করে ১২ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। তবে টার্গেট করা গুলি ভেদ করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির গ্লাস। হামলার পরপরই শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তার তৎকালীন বাসভবন ধানমন্ডির সুধাসদনে।

২১ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন মরহুম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লার রহমানের সহধর্মিণী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভী রহমানসহ ১৬ জন। পরে সবমিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে। হামলায় আওয়ামী লীগের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়ে শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে আজো মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আহত হয়েছিলেন বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা। এখনো অনেক নেতাকর্মী সেদিনের সেই গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতের ক্ষত বয়ে নিয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করছেন। অনেক নেতাকর্মীকে তৎক্ষণাৎ দেশে-বিদেশে চিকিৎসা করালেও তারা এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ‘জজ মিয়া’ কাহিনীর দ্বারা ওই ঘটনা ধামাপাচা দেওয়ার অপচেষ্টাও চলে। এ চক্রান্ত সফল হয়নি। তাই হয়তো আমরা বর্তমান বিশ্বে বুক উঁচিয়ে থাকা ভিন্ন বাংলাদেশ পাই। আর তা সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য। কিন্তু ২১ আগস্ট বিভীষিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যা করা।

আসলে বিরুদ্ধ মতের টুঁটি চেপে ধরা ওই সময়কার সরকারি মদদের কিছু গোষ্ঠী প্রকৃত বাংলাদেশ কোনোকালেই চায়নি। তাদের রক্তচক্ষু ও লকলকে জিহ্বা আজো শানিত। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ; দৃপ্ত শপথে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২১ আগস্ট নারকীয় গ্রেনেড হামলাকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাতের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। ২০ আগস্ট আওয়ামী লীগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তপিপাসু বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ঘনিষ্ঠ সহচর তারেক রহমান, যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নীলনকশায় সংঘটিত হয় গ্রেনেড হামলা।

এতে আরো বলা হয়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টার-মাইন্ড বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পালাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পরিশেষে মানবতার জঘন্য এ হামলার বিচার প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলার বিচার শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারে এসে এর অধিকতর তদন্ত করে।

এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত দুটি মামলার রায়ে জীবিত ৪৯ জন আসামির মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড দেন। বাকি ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন দন্ড পাওয়া এই ১৯ আসামির মধ্যে ১৩ জনই পলাতক। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

সোহেলী চৌধুরী : জনকল্যাণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।

মন্তব্য লিখুন :