পেঁয়াজ নিয়ে তেলেসমাতি : আমাদের করণীয়

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:২২
সোহেলী চৌধুরী
সোহেলী চৌধুরী

পেঁয়াজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড হচ্ছে দেশে। যার শুরু অনেকটা গত বছর। এ বছর ঠিক একই সময়ে তা আবার হচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণ। কিছু কারণ তো বলা যেতেই পারে। প্রতিবেশী ভারত একটি কারণ। দেশের ব্যবসায়ীদের নৈতিক স্খলনও কারণ। এমনকি ভোক্তারাও কারণ। অবাক লাগলেও বিষয়টি খোলাসা করা হবে।

সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দেশের মানুষ বড় বেশি অস্থির। একইসঙ্গে পরনির্ভরশীল। ব্যক্তিগত মত, আমার যা কিছু প্রয়োজন আমাকেই ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যবস্থার জন্য যা যা প্রয়োজন তারও ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেশের জনগণ তা না করে অস্থিরতায় ভুগী এবং আমাদেরই ক্ষতি করি।

প্রায়ই একটি কথা আমরা সবাই বলি, সরকার এটি ঠিক করেনি। একবার ভাবুন আপনিও সরকারের অংশ। এবং সত্যি তা-ই। দেশের প্রতিটি মানুষ সরকারের কোনো না কোনোভাবে অংশ।

এবার কথা হচ্ছে, রান্নার গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ পেঁয়াজ নিয়ে। তা প্রয়োজন অনুযায়ী ফলানো আমাদের দায়িত্ব। আর তা পালন করা হয় না বলেই এত কথা। পেঁয়াজ হয়ে যায় জাতীয় ইস্যু। এমনকি বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে চিন্তিত, তখন আমরা পেঁয়াজ নিয়ে বড় বেশি ভাবিত।

কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ভাবনা থাকলে পেঁয়াজ নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো না। সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে দেশের অনেক সুশীল নানা সময় পেঁয়াজ সংকটে বলে আসছেন পণ্যটি ছাড়াই রান্না করতে এবং এর ব্যবহার কমিয়ে দিতে। অথচ এমন মুহূর্তে আমাদের ভাবার দরকার ছিল কী করলে আমরা পেঁয়াজের দিক থেকে সমৃদ্ধ হতে পারি। একটু সুরাহার নজর দিলে আমাদের কৃষকরাই পারেন পেঁয়াজের সংকট দূর করতে। এর জন্য তাদের প্রয়োজন একমাত্র সহযোগিতা।

কৃষক যেন তার উৎপাদন থেকে বাজারজাত পুরো প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী হন; শিকার নয়। অথচ আমরা দেখি সব সময় কৃষক ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এত ভোগান্তির শিকার হয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলবেন কেন তারা? আমরা সব সময় দেখি সব পণ্যের সব সুবিধা মধ্যস্বত্বভোগীরা পান। এমন কেন হবে? ভাবা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা করোনাকালে এবং একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে ভাবতে পারেন কী কী করলে আর এমনটা হবে না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চাহিদার বিপরীতে একটু কম পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন হয়। উপরের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টরা মাথায় রাখলে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে ক্ষুদ্র ওই পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন সম্ভব হবে। নিন্দুকেরা বলেন, তাহলে প্রতিবেশীকে আর এত ‘তেল’ দিতে হবে না। তাদের পানে চেয়ে থাকা এবং আমাদের জরুরি পণ্য তাদের পাঠানো এক ধরনের ‘তেল’ দেওয়া নয় কি? আমরা যা সব সময় দিয়ে আসছি।

মজার কিংবা কষ্টের বিষয়, আমরা যখন ভারতে ঈর্ষণীয় ইলিশের চালান পাঠিয়েছি তখনই তারা হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। রহস্যপ্রিয় মানুষ বলেন, ইলিশ খেতে তাদের বেশি পেঁয়াজের প্রয়োজন বিধায় এমনটা করেছে। প্রকৃত সত্য, ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। ফলে তারা নিজ দেশের চাহিদা পূরণ করার লক্ষ্যে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। কিন্তু ভারতের বর্তমান কার্যক্রম নেতিবাচকতার জন্ম দিয়েছে। যেমন— তারা কোনো ঘোষণা না দিয়েই এমনটি করেছে। এটি অবশ্যই নিন্দনীয়। আরো নিন্দনীয়, আগে থেকে এলসি করা পেঁয়াজও তারা আটকে দেয়।

গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছিল, ভারত যেন বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ না করে এবং যদি কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশকে যেন আগেই জানানো হয়। গত অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরেও এমন বিধিনিষেধের বিষয় আগে জানানো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও জানা যায়। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তারা তাদের সে ওয়াদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আচমকা এখন আমরা সব ছাপিয়ে পেঁয়াজ নিয়ে বড় বেশি ভাবিত।

এবার আসা যেতে পারে আমাদের ভোক্তাদের কিছু সমস্যা নিয়ে। একইসঙ্গে আমাদের গণমাধ্যমও এ সমস্যায় জড়িত। আমাদের একজন যদি বলেন এই হয়েছে। আমরা কিছু না ভেবেই তাড়াহুড়ো করি। ফলে কিছু না হলেও হয়ে যায়। যার প্রমাণ বিগত কিছুটা সময়। গত বছর এই সময়ে পেঁয়াজ সংকট হয়। অথচ সরকারের কাছে তখনো যথেষ্ট পেঁয়াজ সংরক্ষিত। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের পেঁয়াজ দেশের পথে। অথচ আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি বাজারে। পণ্যটির চাহিদা তখন বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়িক সূত্রে দাম বাড়বেই। পণ্যটির জোগান যথেষ্ট থাকলেও তখন মনে হয় সংকট। আর এ সুযোগটি পান ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট। এদিকে গণমাধ্যমও খবর দেয় এ পণ্যটির সংকট আসতে পারে। এ আসতে পারে প্রচার কিংবা প্রচারণায় পণ্যটির সংকট সত্যিই ঘনীভূত হয়। অথচ একবার ভাবা উচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কতটুকুই-বা জমানো যায়। আর এ জমানো নৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ নয় কি?

কথায় আছে, ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’। ঠিক এমনটিই হয়েছে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে। অবশ্যই তারা খারাপ ভোক্তা ও ব্যবসায়ী। না হয় একজন পণ্য মজুত করবে কেন; আর অন্যজন কেনই-বা প্রয়োজনের বেশি পণ্য ঘরে আনবে। যেখানে পণ্যটির স্বাভাবিক জোগানের কিঞ্চিত বিঘ্ন ঘটেছে।

অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফা লাভের আশায় সব সময়ই চান কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হোক। অথচ তার জানা আছে পণ্যটির খুব বেশি সংকট নেই। একইসঙ্গে তিনি পণ্যটি একটি নির্দিষ্ট দামেই কিনে মজুত করেছেন। ব্যবসার ধর্ম কিংবা যার যার ধর্ম বলে লাভ সহনীয় হওয়া উচিত। কিন্তু আবার বলতে হয় ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’।

না হয় আমাদের কিছু ভোক্তা এমন করতেন না। তারা দেশের কৃষিতে সহায়ক হতেন। নানাভাবে একজন মানুষ কৃষিতে সহায়ক হতে পারেন। তারা একটু করে অনাবাদী জমি আবাদ করে কৃষকের সহযোগী হতে পারতেন। কৃষিকাজে যুক্ত তার স্বজনদের সাহায্য করেও হওয়া যায়। ইচ্ছা থাকলে উপায় মেলে। আমাদের ইচ্ছা আরো এগিয়ে সদিচ্ছার বড় অভাব।

ফলে আমরা বড় বড় কথা বলে নিজের বেলায় মানি না। বঙ্গোপসাগরের মতো সাগর পাশে রেখে লবণ সংকট হয়েছে বলে বাজারে ছুটি। যত পারি লবণ কিনব বলে। মনের কোণে একবারো প্রশ্ন জাগে না সংকট হলেই আর কতটুকু লবণ দৈনন্দিন ব্যবহারে লাগে? আর সংকট হলেই তো কম কেনা উচিত।

জ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবী ছুটছে ধেই ধেই করে। বাস্তবেও তা-ই। কিন্তু আমরা কতটুকু এগুচ্ছি। আমরা আসলে সেই আমরাই রয়ে গেছি। তাই হয়তো ‘খালেদ’ কবিতায় কাজী নজরুলের বিদ্রোহী ভাষা— বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।

বিভিন্ন সময় দেখেছি বাণিজ্যমন্ত্রী এমনকি সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। এখন এই সময়ে উপায় বের করা জরুরি, কীভাবে এই অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙা যায়। না হয় এভাবেই আমাদের ধুঁকতে হবে। গণমাধ্যম ও ব্যবসায়ীরা বলবেন পণ্যটির সংকট। বাস্তব বলবে এসব কৃত্রিম। নানা ঘটনা বলবে পণ্যটি এখন নষ্ট হচ্ছে। পেঁয়াজের গত বছরের ‘সংকটে’ আমরা এমনটি দেখেছি।

সবকিছুর মূলে যেতে হবে সরকারসহ সাধারণ মানুষের। ভোক্তাদের তো অবশ্যই। কারো প্রতি নির্ভরশীলতা ভালো কিছু দেয় না। এমনটি চলতে থাকলে নানা রূপকথার জন্ম হবে। পেঁয়াজের মতো নিরীহ পণ্য জাতীয় আলোচনা হয়ে যাবে। অথচ দেশের কতকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে। বিশ্বের এক একটি দেশ অভাবনীয় সব উদ্ভাবন ঘটাচ্ছে। মানুষ মঙ্গলে কিংবা চাঁদে নিবাস গড়ার কথা ভাবছে।

আর আমরা সামাজিক মাধ্যমে আছি রস সৃষ্টিতে। এ রস দেশের ক্ষতি করছে। কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সবসময় চায় সরকারকে, দেশকে বিপাকে ফেলতে। এতে তাদের লাভ। তাদের খুঁজে বের করে মূলোৎপাটন করার সময় এসেছে। না হয় স্যাটায়ার হবে— কীভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো যায় শিখতে দেশে আসছে বিদেশি প্রতিনিধি দল। গণমাধ্যমে ব্যঙ্গস্বরে কার্টুন প্রকাশ পাবে। যেখানে একটি পেঁয়াজে পানি ঢালছেন একজন মানুষ। অন্য একজন ‘আইসব্যাগ’ পেঁয়াজের মাথায় ঘষবেন। তাদের মুখে পেঁয়াজের উদ্দেশে একটিই কথা, ‘ওস্তাদ মাথা ঠান্ডা করেন’।

পরিশেষে আমাদের সবার উচিত মাথা ঠান্ডা রেখে বিকল্প ভাবা। উড়ো খবরে বাজারে হুমড়ি খেয়ে না পড়া। একটু সহনশীল হওয়া। আর মজুতদার ও গুজব ছড়ানোদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। না হয় কালো প্রেতাত্মারা আমাদের পিছু ছাড়বে না। দেশ স্বাধীন হয়েও সত্যিকার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে না দেশের মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক ও জনকল্যাণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

মন্তব্য লিখুন :