চলচ্চিত্রের চলমান চিত্র বদলাবেই

১২ অক্টোবর ২০২০, ২৩:১২
সোহেলী চৌধুরী
সোহেলী চৌধুরী-ছবি সংগৃহীত

আধুনিক যুগ চলছে। সময় এখন গতিময়। বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির ধেই ধেই করে এগিয়ে যাওয়া অবশ্যই সুখের। কিন্তু সুখের মাঝেও অসুখ থাকে। দেশের চলচ্চিত্র সুখের চেয়ে বেশি অসুখে ভুগছে। কারণ অসংখ্য। আধুনিকতা একটি বড় কারণ। এমন আরো কারণ আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষ চলচ্চিত্র বড় পর্দায় দেখা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে এ পেশার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ এখন ধুঁকছেন। যে মানুষটি দেশের যেকোনো প্রান্তে একটি সিনেমা হলে ছবির রিল পাল্টাতেন; তিনি কিন্তু বেকার কিংবা কষ্টে অন্য পেশায় গেছেন। হয়তো তিনি ভালোও নেই। কিন্তু ইউটিউব-সংশ্লিষ্টরা বেশ ভালোই আছেন। পেশার বদল ঘটেছে। যন্ত্র কিংবা প্রযুক্তি ব্যক্তির শ্রমে ভাগ বসিয়েছে।

কাজের খাতিরে কিংবা ভ্রমণের নেশায় দেশের নানাপ্রান্তে গিয়েছি। দেখেছি অধিকাংশ সিনেমা হল বন্ধ। লাভজনক বহুতল ভবন হয়েছে সেখানে। হয়েছে নানা পণ্যের দোকান। একটি সময় ছিল চলচ্চিত্রেই দেশের মেধাবীদের আবির্ভাব ঘটতো। হয়তো পরিচালক হয়ে, না হয় অভিনেতা। না হয় ভালো মানের সুরকার, গীতিকার; এমনকি গায়ক। এখন এসবের বালাই নেই। আপনার মুঠোফোন ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আপনাকে ব্যস্ত রাখবে। ফলে বেরোবে না কোনো দেশের সম্পদ। জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায় সেলুলয়েডেরই প্রেরণা। হায়রে মানুষ! লিখবেন না সৈয়দ শামসুল হক। এমন ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ আছে। এখন নানা প্রযুক্তির ফাঁদে দেশের মেধাবীরা চলচ্চিত্রে অবদান রাখতে পারছে না। আধুনিকতার কল্যাণে আপনার বাসাই হয়ে যাচ্ছে হোম থিয়েটার। আন্তর্জাল আপনাকে দিচ্ছে সব—যা চাবেন তা-ই পাবেন। সুতরাং চলচ্চিত্রের জন্য সময়টি সংকটেরই। এখানে যারা বাস করেন তারাও কেমন যেন মেকি। ইংরেজি, হিন্দি ও এমনতর ছবির কাহিনী থেকে শুরু করে সবকিছু ককটেল বানিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন যেকোনো মাধ্যমে। হয়ে যাওয়া যাবে সহজেই পরিচালক, শুধু এটাই নয় যা হতে চান, তা-ই আপনাকে বানিয়ে দেব ওই অন্তর্জাল নামক প্রযুক্তি। 

এমন অস্থির সময়ে দেশের সব প্রান্তে চলচ্চিত্র -সংশ্লিষ্ট বিষয়-আসয় সংকটে। গণমাধ্যমের খবরেও বেরোয় অসংখ্য মন খারাপের কথা। এর মাঝে একটি খবর আশাব্যঞ্জক। সিনেমা হলের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বন্ধ সিনেমা হল চালু, সংস্কার ও নতুন সিনেমা হল তৈরিতে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে এক হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ৪ অক্টোবর সচিবালয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা, গবেষক ও প্রশিক্ষকদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ কথা জানান। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমরা আশা করছি, আগামী কয়েক বছর পর সিনেমা শিল্পে একটা বিরাট পরিবর্তন আসবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল চালু, চালু হলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করাসহ অনেক নতুন সিনেমা হল গড়ে ওঠবে। 

তবে আশার খবরের মাঝে নিরাশার খবর হলো, চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা ভালো নেই। করোনার এ সময়ে তারা আগের চেয়ে বেশি সংকটে। রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা হয় সিনেমা নিয়ে। তাদের একটিই কথা নকল ও পাইরেসি বন্ধ করা গেলে চলচ্চিত্র শিল্প সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। আর এর জন্য সরকারের চলচ্চিত্র নিয়ে সুদূরপ্রসারী ভাবনা থাকতে হবে। সর্বশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত তারই বহিঃপ্রকাশ। 

আমরাও যারা চলচ্চিত্রপ্রেমী, আশাকরি দেশের চলচ্চিত্র একদিন ঠিকই সুদিনে ফিরবে। আমাদের আর শুনতে হবে না হতাশার কথা। মে মাসে জার্মানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানায়, করোনায় ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কয়েক মাস ধরে বন্ধ নাটক-সিনেমার শুটিং। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুটিং শুরুর সিদ্ধান্ত হলেও ভালো চলচ্চিত্র মুক্তি না পেলে সিনেমা হলগুলো ভরবে না। ফলে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে। 

প্রতিবেদনে ডয়চে ভেলে জানায়, এ বছর সাধারণ ছুটির মধ্যে ঘরবন্দি অবস্থায় কেটেছে বাংলাদেশের বড় দুই উৎসব বাংলা নববর্ষ ও ঈদ। সাধারণত ঈদ ও নববর্ষের সময় বাংলাদেশে সিনেমা হলগুলোতে সবচেয়ে বেশি সিনেমা মুক্তি পায়; এবার তা হয়নি। এই সময়ে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা প্রায় ১৫টি চলচ্চিত্র আটকে গেছে। সেইসঙ্গে সিনেমা হল বন্ধ থাকায় এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ কোটি টাকা বলে জানায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলচ্চিত্রে অনেক শিল্পী-কলাকুশলী দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। শুটিং বন্ধের সময়ে তাদের অনেকে বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লোকসানের মুখে ধুকতে থাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) কর্মীদেরও  বেতন বন্ধ ছিল। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ‘অনুদান’ হিসেবে পাওয়া ৬ কোটি টাকা থেকে ২৬১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কিছু মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। তবে দৈনিক মজুরির শিল্পী-কলাকুশলীরা এর আওতায় পড়েননি। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। 

প্রতিবেদনে জানানো হয়, লকডাউনে সিনেমা হল মালিকরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। আয় না থাকায় আটকে যায় কর্মচারীদের বেতন। হল মালিকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কী উদ্যোগ নেওয়া যায় সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। জুন মাসে অন্য এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থা বিবিসির বাংলা সংস্করণ জানায়, করোনাভাইরাসে ফ্যাকাসে ঢাকাই সিনেমার রঙিন দুনিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে আরো অনেক খাতের মতো করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়ে দেশটির বিনোদন শিল্প চলচ্চিত্র জগতেও। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে বছরে ৫০টির মতো সিনেমা মুক্তি পায়। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে এর মধ্যেই সাড়ে তিনশো কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। 

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উঠে আসে। বলা হয়, ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ বাংলাদেশে ৮৮টি সিনেমা হল চালু ছিল। কিন্তু নতুন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এর কতগুলোকে আবার চালু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে। এমন সব হতাশার খবরেও চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। ঘুরে দাঁড়াবে শিল্পটি। নতুন করে কোনো হতাশার খবর আসবে না। চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কোনো হতাশার ছাপ মিলবে না। তাদের সবকিছু বলবে তারা ভালো আছেন। খুব বেশি অসম্ভব কিছু কি?

সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছা পারে পরিবর্তন আনতে। আবারো সরব হবে সব। টিকিট কেটে বড় পর্দায় পরিবারসহ ছবি দেখবে সবাই। আপামর মানুষ চলচ্চিত্র বলতে ছবিই বোঝে। আবারো শত হতাশার মাঝে আশাকরি মুখর হবে সব। বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য জেগে ওঠবে। বাবার কাছে বায়না ধরে ছবিঘরে যাবে কোনো কিশোর। সিরাজউদ্দৌলা বেশে ভরাট গলা ভাসবে আনোয়ার হোসেনের মতো নতুন কারো। চরম রোমাঞ্চ হবে মনিহার কিংবা মতিহারে। গ্রামীণ বধূ কিংবা কিশোরী আঁৎকে উঠবে শাবানার মতো নতুন কোনো নায়িকার বিপদে। গান বাজবে সিনেমা হলে— শাবানা-ববিতা ওরা আছে সিনেমায়। চলচ্চিত্র শিল্পীরা হবে সবার কাছে ঈর্ষণীয়। ছুটির ঘণ্টা কিংবা আধুনিক রঙিন রূপবানে ভরবে সবার হূদয়। নতুন বেশে কোনো সংশপ্তক হবে। পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসে আসবে কোনো হূদয় হরণকারী নায়ক। না হয় ফারুক হয়ে সালমান শাহর জনপ্রিয়তা ধরে আসবে বাংলার ডেনিয়েল ক্রেগ। বড় কিছু সৃষ্টির উৎস হবে চলচ্চিত্র। একজন কবি বসে থাকবেন চলচ্চিত্রে নতুন কোনো গান লেখার জন্য। বেতার কিংবা দূরদর্শনে হবে বাংলা চলচ্চিত্রের অনুরোধের আসর। সবই সম্ভব সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। একজন রিকশাওয়ালা মনের সুখে সারাদিনের কষ্ট ভুলে বলাকায় যাবেন সিনেমা দেখতে। একজন প্রেমিক দুটি টিকিট কেটে আনবে নতুন মুক্তি পাওয়া কোনো ছবির। সেদিন বেশি কাছে না হলেও স্বপ্ন দেখতে পারি। স্বপ্নই বাস্তবের রূপ হয়ে আসে এবং একদিন তাই হবে। আশাবাদীর দলে আমি।

লেখক : সাংবাদিক ও জনকল্যাণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।

মন্তব্য লিখুন :