‘পকেট কমিটি’ গঠনে সতর্ক আ. লীগ

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৪৮
অনুসন্ধান প্রতিবেদক

সারাদেশের তৃণমূলের কমিটিতে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের জায়গা দিতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এতদিন এতে বাধা ছিল স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার প্রভাবশালী নেতাদের নিজস্ব বলয়। এবার তা ভাঙতে চায় বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী দলটি। 

এবার যাতে ‘পকেট কমিটি’ গঠন না হয় তার জন্য সতর্ক ক্ষমতাসীন দলটি। এবার দলটির নীতিগত অবস্থান হলো, কমিটিতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পরীক্ষিতদের স্থান দিতে হবে। যার কারণে জমা পড়া জেলা কমিটিগুলো অতীতের মতো ঢালাওভাবে অনুমোদন না দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তৃণমূলের কমিটির মতো দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রেও একইপন্থা অবলম্বন করা হবে। 

আওয়ামী লীগের একাধিক বিশ^স্ত সূত্র এবং সম্প্রতি তৃণমূলে পাঠানো নির্দেশনায় এসব তথ্য জানা যায়। 

গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সভায় জেলা কমিটি অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সভায় দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টই জানিয়ে দেন বিতর্কিতদের দলে স্থান দেওয়া যাবে না। দুঃসময়ের পরীক্ষিত ও ত্যাগীদের দলের নেতৃত্বে আনতে হবে। এ সময় তিনি জমা পড়া কমিটিগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কথাও বলেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার প্রভাবশালী নেতারা তাদের ‘মাইমেন’ বা অনুগতদের জেলা ও উপজেলাসহ তৃণমূলের কমিটিতে স্থান দিয়েছে। এই সুযোগে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগের অবস্থান পোক্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রী-সন্তান ভাই-বোনসহ আত্মীয়-স্বজনদের তৃণমূলের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে দেখা গেছে। এতে ক্ষোভে-দুঃখে-হতাশায় তৃণমূলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা সংগঠন বিমুখ হয়ে পড়েন। যার কারণে আওয়ামী লীগের ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’খ্যাত তৃণমূল সংগঠন ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। 

অন্যদিকে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের বিতর্কিত কর্মকা-ে দল ও সরকারকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ তার একটি অন্যতম উদাহরণ বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানা গেছে, দলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় এসব কমিটি যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রতিটি বিভাগের জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রতি দুটি বিভাগের জন্য একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রতিটি বিভাগের জন্য সভাপতিম-লীর একজন সদস্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবেন। এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যাদের বাড়ি যে এলাকায় তারা ওই এলাকার যাচাই-বাছাইয়ে সহযোগিতা করবেন।

আওয়ামী লীগ গত বছর ২০ ও ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩১ জেলায় সম্মেলন শেষ করে। একই সময় শেষ হয় ছয়টি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলনও।

এদিকে যেসব জেলা সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশে তার প্রায় সব পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা পড়েছে। ইতোমধ্যে বেঁধে দেওয়া সময় ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বৃষ্টির মতো তালিকা জমা পড়ে বলে আওয়ামী লীগের দফতর সূত্রে জানা যায়। ওই তালিকা নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর এর সভাপতিম-লীর সভায় পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে ওই সভায় বাকি কমিটির তালিকা জমা দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দেওয়া হয়। গত কয়েক দিনে আরও কয়েকটি কমিটি জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে তৃণমূলে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যেন মূল্যায়ন করা হয় সেজন্য নির্দেশনা দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি। জেলা ও মহানগর, উপজেলা ও থানা এবং পৌর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের উদ্দেশে চিঠি পাঠিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। চিঠিতে বলা হয়, ‘নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ত্যাগী-পরীক্ষিত-সৎ, বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও করোনাকালীন সময়ে যারা দেশের মানুষের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে ১৭ সেপ্টেম্বর তৃণমূল সংগঠনকে এই চিঠি পাঠায় আওয়ামী লীগ। সূত্র মতে, কুরিয়ার সার্ভিসের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এই চিঠি সংশ্লিষ্ট নেতাদের পাঠিয়েছেন।

তৃণমূলে পাঠানো আওয়ামী লীগের ওই চিঠিতে পাঁচটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে- ১৬ সেপ্টেম্বর গণভবনে প্রেসিডিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিম্নলিখিত সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনাগুলোর মাঝে ৪ নম্বরে বলা আছে, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ত্যাগী-পরীক্ষিত-সৎ, বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও করোনাকালীন সময়ে যারা দেশের মানুষের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

জেলা সম্মেলনগুলোতে বক্তব্যকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পকেট কমিটি গঠন না করতে তৃণমূল নেতাদের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘ঘরের মধ্যে ঘর করে, মশারির মধ্যে মশারি, আত্মীয়করণ করে চৌদ্দপুরুষকে নিয়ে আওয়ামী লীগের পকেট কমিটি করে। পকেট কমিটি চলবে না। পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই, কমিটি করতে গিয়ে দল ভারি করার জন্য খারাপ লোক টেনে আনবেন, এটা চলবে না। বসন্তের কোকিল আমরা চাই না, দুঃসময়ের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে।’

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) একটি অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘যেসব কমিটি জমা হয়েছে তা আমরা হঠাৎ করে দিয়ে দেবো না। যাচাই-বাছাই করে পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা আছেন কি না সেটা দেখা হবে।’

জমা পড়া কমিটি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘অনেক জায়গায় দেখা গেছে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। নিজস্ব লোকজন দিয়ে কমিটি ভর্তি করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা, পরীক্ষিত কর্মীরা কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। এটা কোনো অবস্থাতেই হতে পারে না। সেটা আরও খোঁজখবর নিয়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’

পরবর্তীতে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জেলা-মহানগর পর্যায়ে যেসব কমিটি হবে সেখানেও অবিতর্কিত, ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে বলে শনিবার তিনি আশ্বাস দেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘যোগ্য ও ত্যাগীরা যাতে কমিটিতে স্থান পায় এবং বিতর্কিতরা যাতে আসতে না পারে তার জন্য আমরা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অতিথি কমিটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কোনো কোনো কমিটিকে আপনারা সাংবাদিকরা পকেট কমিটি বলেছেন। আমি সেভাবে বলতে চাই না। তবে একক কোনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে কমিটি চলে যাবে, এমনটা যে না হয় আমরা সেটা চাইবো।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, ‘যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে জেলা কমিটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে সভাপতিম-লীর সভায়। দলের মধ্যে যারা নিবেদিত তারা যাতে কমিটিতে আসতে পারে তার জন্য এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

যাচাই-বাছাই করে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের অন্তর্ভুক্তি কঠিন কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষে তৃণমূলে যাচাই-বাছাই করা সত্যিই কষ্টসাধ্য। এক্ষেত্রে আমাদের জেলা নেতাদের তালিকার ওপর ভর করতে হয়। তবে জেলা থেকে যে কেউ যদি অভিযোগ অনুযোগ করেন, আমরা সেটা যাচাই করে দেখতে পারবো।’

মন্তব্য লিখুন :